সারসংকটে আবাদ খরচ বেড়ে বড় বিপাকে রয়েছেন কৃষকরা। এর ওপর ডিজেলসংকট যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে তাঁদের ওপর। বোরো মৌসুমে টাকা দিয়েও ডিজেল না মেলায় দিশাহারা পাবনার কৃষকরা। তবে কৃষি বিভাগ দাবি করছে, কৃষকদের ভোগান্তি শিগগির কেটে যাবে।
সারসংকটে আবাদ খরচ বেড়ে বড় বিপাকে রয়েছেন কৃষকরা। এর ওপর ডিজেলসংকট যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে তাঁদের ওপর। বোরো মৌসুমে টাকা দিয়েও ডিজেল না মেলায় দিশাহারা পাবনার কৃষকরা। তবে কৃষি বিভাগ দাবি করছে, কৃষকদের ভোগান্তি শিগগির কেটে যাবে।
কৃষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় সারের দাম ব্যাপক হারে বেড়েছে। কোনো কোনো সারে বস্তাপ্রতি দাম বেড়েছে হাজার টাকা। তার পরও মিলছে না কয়েক ধরনের সার। বোরো ধান আবাদের মৌসুমে খরচ বাড়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন কৃষকরা। কিন্তু ডিজেলসংকট যুক্ত হওয়ায় একেবারে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তাঁরা। অনেক কৃষক টাকা ও বোতল নিয়ে ডিজেলের জন্য পাম্পস্টেশনে ঘুরে খালি হাতে ফিরছেন। বাধ্য হয়ে কেউ কেউ গ্রামের খুচরা দোকান থেকে ৫০-৬০ টাকা অতিরিক্ত দামে অল্প কিছু ডিজেল কিনছেন। এটিও তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত নয়। কারণ চারা প্রস্তুত থাকলেও অনেক কৃষক সেচ দিয়ে জমি প্রস্তুত করতে পারছেন না। আবার কেউ কেউ চারা রোপণ করলেও পর্যাপ্ত সেচ দিতে পারছেন না।
চর সাদিপুরের বোরো ধান চাষি আলামিন। পাঁচ বিঘা জমিতে আগাম বোরো ধান রোপণ করেন তিনি। সম্প্রতি পাবনা শহরের অনন্তবাজার এলাকার পেট্রল পাম্পে ডিজেল নিতে এসে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে জানান, ৫০ টাকা গাড়িভাড়া দিয়ে এসে দুই-তিন ঘণ্টা বসে থেকে ৫-১০ লিটার তেল মেলে। দুই দিন পর আবার এসে বসে থাকতে হয়। চাহিদা অনুযায়ী তেল মেলে না। এভাবে তো আবাদ হয় না।
সাদিপুর ইউনিয়নের ভ্রমড়ার মোড় এলাকার তয়েব মোল্লা বলেন, সাত বিঘা আবাদ করেছি। ধানের বয়স ১৫ দিন। এখন তেল বেশি লাগবে। কম হলেই ধান নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু চাহিদামতো ডিজেল পাচ্ছি না। সামাদ, আরশেদ ও রশিদসহ কয়েকজন কৃষক জানান, তিন মাসের মতো ধানের জমিতে সেচ দিতে হয়। এতে অঞ্চলভেদে এক বিঘা জমিতে প্রায় ৫০ লিটার ডিজেল লাগে। এতে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা খরচ হয়। এই তেল খোলাবাজারের দোকান থেকে অতিরিক্ত দামে নিতে গেলে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা বেশি লাগবে। এদিকে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি হয়। বিঘায় ফলন হয় ২২-২৩ মণ। ইঞ্জিন ও অন্যান্য খরচ বাদে মণ বিশেক ধান টেকে। তাতে ধান বিক্রি করে হাজার বিশেক টাকা পান কৃষক। এর বিপরীতে খরচ ১৮-২০ হাজার টাকা।
চর সদিরাজপুরের কৃষক হাসান বলেন, শুধু চারা লাগাতেই ছয়-সাত হাজার টাকা খরচ। এক দিন পর পর বিঘায় দুই লিটার তেল লাগবেই। সব মিলিয়ে ১৮-২০ হাজার টাকা খরচ হয়। ধানে লাভ নেই। খড়টুকু লাভ। কিন্তু এবার কী হবে কে জানে।
চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়ালের কৃষক আব্দুল হাকিম বলেন, ডিজেলের জন্য চাষেও খরচ বেড়েছে। গত বছর ৩৫০ টাকায় এক বিঘা জমি চাষ দিয়েছি। এবার ডিজেলসংকটের কারণে ৪৫০ টাকা লাগছে। কোথাও কোথাও এর চেয়ে বেশি লাগছে। লেবারের দামও বাড়তি। ধানের দাম বেশি না হলে লোকসান হবে কৃষকদের।
পাবনা অনন্তবাজার এলাকার মেসার্স হাইওয়ে পেট্রল পাম্পের ব্যবস্থাপক সঞ্জয় কুণ্ডু বলেন, স্বাভাবিক সময়ে দিনে সাধারণত চার হাজার লিটার ডিজেল লাগত। বোরো মৌসুমে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার লিটার লাগত। সাধারণ সময়ে সব কৃষক আমাদের কাছে আসতেন না। তাঁরা স্থানীয় বাজার বা ডিলারদের থেকেও সংগ্রহ করতেন। কিন্তু এখন সবাই আমাদের কাছেই আসছেন। এতে পাম্পে চাপ বেড়েছে। ডিজেল যতই পাচ্ছি, সবই মুহূর্তে ফুরিয়ে যাচ্ছে।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, জেলায় এবার বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৬ হাজার ৪৪৫ হেক্টর। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৫৬ হাজার ২৮৫ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ২০ হাজার ৫২৮ হেক্টর বোরো আবাদের জমি ডিজেলচালিত যন্ত্রে সেচের আওতাধীন। এসব জমিতে সেচ দিতে কৃষকদের সাময়িক ভোগান্তি হলেও সেটি উৎপাদনে তেমন প্রভাব পড়বে না বলছে কৃষি বিভাগ। পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন প্রামাণিক বলেন, শুরুতে কৃষকদের কিছুটা ভোগান্তি গেছে। তবে এখন সেটি অনেকটাই নেই। কৃষকরা যেন সঠিকভাবে ডিজেল পান, সেটি নিশ্চিত করতে পাম্পগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আশা রাখছি, কৃষকদের আর কোনো ভোগান্তি থাকবে না।