দেশজুড়ে ডিজেল সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে নদী ও সাগরনির্ভর মৎস্য খাত। জ্বালানি না পেয়ে মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার ঘাটে বেঁধে বসে আছেন হাজার হাজার জেলে। এতে শুধু জেলেরা নয়, আড়তদার, শ্রমিক, বরফকল মালিক, পরিবহনকর্মীসহ পুরো মৎস্যভিত্তিক অর্থনীতি চাপে পড়েছে। মানবেতর জীবনযাপন করছেন জেলেরা। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার সুরেশ্বর এলাকার জেলে সুভাষ দাস ৭ দিন ধরে নৌকা নিয়ে ঘাটে বসে আছেন। নদী, জাল ও ইঞ্জিন সব থাকলেও ডিজেল না থাকায় নদীতে যেতে পারছেন না। তিনি জানান, নদীতীরের হাটবাজারে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও পাওয়া গেলেও লিটারপ্রতি ৬০-৭০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, যা দিয়ে মাছ ধরে খরচ ওঠানো সম্ভব নয়। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটছে। তার মতো আরো অনেক জেলেরই একই অবস্থা। জেলেরা জানান, দেশের প্রায় সব নদী ও উপকূলীয় এলাকায় একই অবস্থা। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের মৎস্য খাতে। অনেক এলাকায় মাছ আহরণ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ফলে উপকূলীয় মৎস্যবন্দর ও মোকামগুলোতেও কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। খাত-সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে সমুদ্রগামী ট্রলার পরিচালনার ব্যয় প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি, খাবার, বরফ ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে খরচ বেড়ে যাওয়ায় মাছ বিক্রি করেও খরচ ওঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে আবার এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শুরু হচ্ছে টানা ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। জেলেরা বলছেন, জ্বালানি সংকট ও নিষেধাজ্ঞা মিলিয়ে তারা বড় ধরনের সংকটে পড়বেন। ঘাটের মাঝিরাও জানান, তেল না থাকলে নৌকা চলবে কীভাবে—এ অবস্থায় আয়-রোজগার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ। পরিবারসহ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ লাখ। প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার নদী ও সাগরে যায়, যার জন্য দৈনিক প্রায় ১৫ থেকে ২৫ লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। মাঝি আমিনুল হক জানান, তেল না থাকায় নৌকা চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আগে ১০০ টাকার তেল এখন ১৮০-২০০ টাকাতেও পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পটুয়াখালী, বরগুনা, খুলনাসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় দেখা গেছে, শত শত ট্রলার ঘাটে বাঁধা পড়ে আছে। অনেক আড়তে মাছ সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে শত শত শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। কোথাও কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি দিলেই কেবল ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ জেলেদের। মৎস্য অধিদপ্তরের ভরাপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. জিয়া হায়দার চৌধুরী বলেন, ঈদের পরে হাটবাজারে জ্বালানির কিছুটা সংকট দেখা দিয়েছে। আমরা অভিযোগ পাচ্ছি কিছু এলাকার জেলেরা তেল পাচ্ছেন না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। শীঘ্রই ব্যবস্থা হবে।






