দেশের সবচেয়ে বড় ধান উৎপাদন মৌসুম ইরি-বোরোর আবাদ এখন পুরোদমে চলছে। সরকারি হিসাবে সার ও জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত থাকার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সারের কৃত্রিম সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি এবং ডিজেলের ঘাটতির কারণে সেচ ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা।
উত্তরাঞ্চলসহ একাধিক জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। ডিলাররা অনেক ক্ষেত্রে ‘সরবরাহ নেই’ বলে দাবি করলেও খুচরা বাজারে বেশি দামে তা বিক্রি হচ্ছে। এতে বাধ্য হয়ে কৃষকদের বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার এক কৃষক বলেন, কয়েক দিন ধরে ডিজেলের সংকটের কারণে সময়মতো জমিতে পানি দেওয়া যাচ্ছে না। মাঝেমধ্যে সামান্য তেল পাওয়া গেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
সম্প্রতি কিছু বৃষ্টিপাত হওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া গেলেও আবহাওয়া প্রতিকূল হলে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
একই এলাকার একজন পাম্পচালক জানান, স্থানীয় ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের সরবরাহ সীমিত। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও প্রয়োজনমতো ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সেচ কার্যক্রম নিয়মিত রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, সারের বাজারে অস্বাভাবিকতা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও প্রতি কেজিতে ৩ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে।
আবার বস্তাপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন কৃষক।
সরকারি হিসাবে দেশে বর্তমানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার মজুত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি বোরো মৌসুমে সারের কোনো ঘাটতি হবে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বিকল্প উৎস থেকে আমদানি ও বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কৃষি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের সারের একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমদানি করা হয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার। একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদনও গ্যাসনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা বাজারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
সেচ খাতেও একই ধরনের চাপ দেখা যাচ্ছে। দেশে বোরো আবাদ মূলত সেচনির্ভর, যার বড় অংশই ডিজেলচালিত। বর্তমানে ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি ডিজেল বিক্রি করা হচ্ছে না।
এ অবস্থায় খুচরা পর্যায়ে বেশি দামে ডিজেল বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। এতে সেচ খরচ বাড়ছে। কৃষকেরা বলছেন, ডিজেলের দাম লিটারে কয়েক টাকা বাড়ায় প্রতি হেক্টরে অতিরিক্ত কয়েক শ টাকা খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
তবে সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে জ্বালানি সংকট নেই এবং কোথাও সেচ কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তাদের মতে, ভবিষ্যৎ সংকটের আশঙ্কায় কৃষকদের মধ্যে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হওয়ায় এমন পরিস্থিতি দেখা দিচ্ছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি আরও সতর্কভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দেশের বোরো আবাদে ৬০ শতাংশের বেশি সেচ ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানি সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও উৎপাদনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তারা বলছেন, বর্তমান মজুত দিয়ে চলতি মৌসুম সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক না থাকলে পরবর্তী আমন মৌসুমে সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
চলতি বছরে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ লাখের বেশি হেক্টর জমিতে। এই বিপুল আবাদ নির্বিঘ্ন রাখতে হলে সার ও জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষকদের ভাষায়, “কাগজে সব ঠিক থাকলেও মাঠে যদি সার ও তেল না পাওয়া যায়, তাহলে সেই মজুত দিয়ে কোনো লাভ নেই।”
বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু সরবরাহ ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ নয়, বরং দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠছে।






