বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক বা সাহসী নেত্রী নন; বরং তিনি ছিলেন ইসলামী মূল্যবোধ, জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং অদম্য দেশপ্রেমের এক সুদৃঢ় কণ্ঠস্বর। তাঁর প্রয়াণে দেশ এক মমতাময়ী অভিভাবককে হারাল, আর উম্মাহ হারাল এক নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্বকে। মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিপরীক্ষায় অকুতোভয় এক নারী বেগম খালেদা জিয়ার দেশপ্রেমের শুরু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঊষালগ্ন থেকে। ১৯৭১ সালে যখন দেশ মাতৃকাকে মুক্ত করতে তাঁর স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তখন দুই অবোধ শিশু সন্তানসহ বেগম জিয়াকে বরণ করতে হয়েছিল অমানুষিক নির্যাতন ও কারাবাস। হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি থাকা সত্ত্বেও তিনি যে অসীম ধৈর্য ও সাহসিকতা প্রদর্শন করেছিলেন, তা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি ছিলেন রণাঙ্গনের বীর সেনানির সহধর্মিণী, যিনি পর্দার অন্তরালে থেকে এক দীর্ঘ যুদ্ধের নীরব সাক্ষী ও ত্যাগী যোদ্ধা।
একজন সৈনিকের স্ত্রী হিসেবে তাঁর জীবন ছিল শৃঙ্খলা, ত্যাগ ও শৌর্য-বীর্যের সংমিশ্রণ। স্বামীর কর্মজীবনের সুকঠিন দিনগুলোতে তিনি ছিলেন স্থৈর্যের প্রতীক। স্বামীর শাহাদাতের পর দেশের এক চরম ক্রান্তিলগ্নে তিনি গৃহবধূ থেকে রাজপথে নেমে এসেছিলেন শুধুমাত্র দেশপ্রেম ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার তাগিদে। একজন সেনাপত্নীর শৃঙ্খলাবোধ ও আপসহীন মনোবলই তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি দান করেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি সংকটে তাঁর ঈমানী দৃঢ়তা পরিলক্ষিত হয়েছে। মহান আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাসই ছিল তাঁর সাহসের মূল উৎস। ব্যক্তিগত জীবনের চরম ট্র্যাজেডি—স্বামী ও সন্তান হারানো এবং দীর্ঘ কারাবাসের যাতনা—তিনি সহ্য করেছেন পরম ধৈর্য (সবর) ও শোকরের সাথে। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী ‘বিপদে ধৈর্যধারণ’ করার যে গুণ, তা তাঁর জীবনে বারবার প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি ইসলামের প্রচার ও প্রসারে এবং দ্বীনি শিক্ষার মানোন্নয়নে বহু প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন:
মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন: ফাজিল ও কামিলকে সাধারণ শিক্ষার সমমান প্রদানের মাধ্যমে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মূলধারার সাথে যুক্ত করার ঐতিহাসিক কৃতিত্ব তাঁর সরকারের।
বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও ইসলামী তাহজিব-তমুদ্দুনকে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মানের সাথে তুলে ধরতে তিনি সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন।
সারা দেশে অসংখ্য মসজিদ নির্মাণ ও সংস্কারে সহায়তা এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে তিনি দ্বীনি দাওয়াতের পথ প্রশস্ত করেছিলেন।
মুসলিম উম্মাহর সাথে সংহতি
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া সবসময় মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতির পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। ওআইসি (OIC)-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে মুসলিম দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। ফিলিস্তিনসহ নির্যাতিত মুসলিম দেশগুলোর প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল অকৃত্রিম, যা তাঁকে মুসলিম বিশ্বের কাছে একজন সম্মানিত নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
ক্ষমতার সুউচ্চ শিখরে থেকেও বেগম জিয়ার ব্যক্তিগত জীবন ছিল অত্যন্ত অনাড়ম্বর এবং ধর্মীয় অনুশাসন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাঁর পরিশীলিত চালচলন এবং পর্দা ও শালীনতার প্রতি অবিচল নিষ্ঠা কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে তাঁর জন্য বিশেষ শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি করেছিল। তিনি শিখিয়েছিলেন যে, আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের পালন একই সাথে সম্ভব।
পবিত্র কুরআনের বাণী অনুযায়ী—”প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।” আজ বেগম খালেদা জিয়া সেই অমোঘ সত্যের যাত্রী হয়ে মহান রবের দরবারে ফিরে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন তাঁর ত্যাগ, দেশ ও জাতির জন্য তাঁর আত্মত্যাগ এবং ইসলামের কল্যাণে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা নিশ্চয়ই তাঁর জন্য সাদাকায়ে জারিয়া হিসেবে গণ্য হবে।
আমরা দোয়া করি, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর সকল নেক আমল কবুল করুন, তাঁর ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মকাম দান করুন। বাংলাদেশের মানুষ তাঁদের এই প্রিয় ‘দেশনেত্রী’কে কেবল তাঁর রাজনৈতিক অর্জনের জন্য নয়, বরং তাঁর বীরত্বগাথা, ঈমানী দৃঢ়তা ও উন্নত চরিত্রের জন্য চিরকাল স্মরণ রাখবে।
ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
বিদায়, আপোষহীন নেত্রী। আপনি চিরকাল আামাদের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন।