ঢাকা, ৩ মার্চ ২০২৬: বাংলাদেশের হাইকোর্ট বিভাগ আজ (৩ মার্চ) জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথের বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন। বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ পৃথক দুটি রিট আবেদনের শুনানি শেষে এই রুল জারি করেন। রুলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানতে চাওয়া হয়েছে, এসব অধ্যাদেশ ও আদেশ কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না।
রিটকারীরা (সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গাজী মো. মাহবুব আলম এবং চৌধুরী মো. রেদোয়ান-ই-খোদাসহ অন্যান্য) যুক্তি দেখিয়েছেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন) এসব অধ্যাদেশ জারি করে সংবিধানের সীমা লঙ্ঘন করেছে। বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোট বা ‘জাতীয় সনদ’-এর মতো কোনো কাঠামোর সরাসরি বিধান নেই। সংবিধানের ৭, ৭ক, ৭খ, ৬৫, ১২৩ এবং ১৪২ অনুচ্ছেদের আলোকে সংবিধান সংশোধন বা গণভোটের প্রক্রিয়া শুধুমাত্র নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে সম্ভব, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশের মাধ্যমে নয়।
রিট আবেদন ও আইনি বিশ্লেষণ অনুসারে মূল কারণগুলো নিম্নরূপ:
অন্তর্বর্তী সরকারের সীমিত ক্ষমতা:
সংবিধানে অন্তর্বর্তী সরকারের (বা তত্ত্বাবধায়ক/অন্তর্বর্তীকালীন) কোনো সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা নেই যা সংবিধান সংশোধন বা নতুন সাংবিধানিক কাঠামো (যেমন দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, সংস্কার পরিষদ গঠন) চাপিয়ে দেওয়ার অনুমতি দেয়। অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা (অনুচ্ছেদ ৯৩) শুধুমাত্র জরুরি আইনি শূন্যতা পূরণের জন্য, মৌলিক সংস্কার বা সংবিধান পুনর্গঠনের জন্য নয়।
সংবিধানের মৌলিক কাঠামো লঙ্ঘন:
জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর বাস্তবায়ন আদেশ (১৩ নভেম্বর ২০২৫ জারি) এবং গণভোট অধ্যাদেশ (২৫ নভেম্বর ২০২৫) নির্বাচিত সংসদকে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এ রূপান্তরিত করে, যা সংবিধানের ধারাবাহিকতা (continuity) ভঙ্গ করে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭খ-এর মৌলিক কাঠামো (basic structure) পরিবর্তনের জন্য গণভোট বা অধ্যাদেশের কোনো বিধান নেই।
গণভোটের অসাংবিধানিক প্রক্রিয়া:
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু সংবিধানে গণভোটের কোনো বিধান নেই (শুধুমাত্র সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট)। এটি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪২ লঙ্ঘন করে।
অধ্যাদেশের অতিরিক্ত ব্যবহার:
ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪-২০২৬ সালে শতাধিক অধ্যাদেশ জারি করেছে, যার অনেকগুলো সংবিধানের সীমা ছাড়িয়ে গেছে বলে সমালোচনা রয়েছে। এগুলো সংসদীয় অনুমোদন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনে, যা অসাংবিধানিক। রুলের জবাব দিতে হবে সরকার, আইন মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের। রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জুলাই সনদ-সংক্রান্ত কার্যক্রম স্থগিত রাখার আবেদনও করা হয়েছে।
এই রুলের ফলে ২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় সংস্কার উদ্যোগ ‘জুলাই চার্টার’-এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আইনি জটিলতায় পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো রক্ষা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতার সীমা নিয়ে বড় বিতর্কের সূচনা করতে পারে।






