ফিয়াদ নওশাদ ইয়ামিন
রাতের অন্ধকারে যখন আবাসিক মাদ্রাসার দরজা বন্ধ হয় অভিভাবকেরা ভাবেন, ভেতরে তাদের সন্তানের নিরাপদ।
কিন্তু যদি সেই দরজার ভেতরেই নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে? যদি যাকে অভিভাবক বিশ্বাস করে সন্তানের দায়িত্ব দিয়েছেন, সেই হাতই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় হুমকি? নেত্রকোনার ঘটনাটি সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নকে আর চাপা থাকতে দেয়নি।
নেত্রকোনার মদনে ১২ বছরের এক মাদ্রাসাছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার অভিযোগ ঘিরে যে ঘটনা সামনে এসেছে, তা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয় এটি আমাদের শিক্ষা ও সামাজিক কাঠামোর গভীর এক সংকটের নগ্ন প্রতিফলন। স্থানীয় থানায় দায়ের করা অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্ত একজন মাদ্রাসা শিক্ষক, যিনি একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ক্ষমতাবান অবস্থানে যুক্ত ছিলেন। ভুক্তভোগী শিশুটি আবাসিক পরিবেশে পড়াশোনা করত, পরিবার থেকে দূরে থেকে শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে থাকা সেই নিরাপত্তার জায়গাটিই পরিণত হয়েছে ভয়াবহ নির্যাতনের স্থানে। অভিযোগে উঠে এসেছে, ঘটনাটি গোপন রাখতে হুমকি, প্রভাব খাটানো এবং পরবর্তীতে ভুক্তভোগীকে প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা—যা একটি সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও অপরাধ আড়াল করার সংস্কৃতিকে নির্দেশ করে।
এই রিপোর্টে যে চিত্রটি ফুটে উঠেছে তা আরও উদ্বেগজনক অভিযুক্ত শিক্ষক শুধু শিক্ষক নন, প্রতিষ্ঠানের পরিচালনাতেও যুক্ত। অর্থাৎ যিনি নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, তিনিই হয়ে উঠেছেন ঝুঁকির কেন্দ্র। এখানেই প্রশ্ন জোরালো হয়—একটি আবাসিক মহিলা মাদ্রাসায় পুরুষ শিক্ষক রাখার কাঠামো আদৌ কতটা নিরাপদ বা যৌক্তিক?
এই প্রশ্নকে তাত্ত্বিক বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই, কারণ একই সময়ে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা সংবাদগুলো একই ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৬ সালের ৩ এপ্রিল নোয়াখালীতে এক মাদ্রাসা শিক্ষক মোহাম্মদ মারুফ ছাত্র ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন বলে জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ৬ এপ্রিল চাঁদপুরে নাসিরুল্লাহ বাহাদুর নামে এক শিক্ষক ছাত্রীকে চেতনানাশক খাইয়ে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন বলে সমকাল জানায়। একই মাসে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ‘জ্বীন তাড়ানোর’ অজুহাতে এক ছাত্রীকে নির্যাতনের চেষ্টার অভিযোগ ওঠে শিক্ষক আবুল খায়েরের বিরুদ্ধে, যেখানে অভিযোগ দায়েরের পর ভুক্তভোগীর পরিবারও হামলার শিকার হয়। এই ঘটনাগুলো একত্রে একটি বাস্তবতা সামনে আনে এগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং নজরদারি ও কাঠামোগত দুর্বলতার ফল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করতে হবে সব পুরুষ শিক্ষক অপরাধী নয়। কিন্তু প্রশ্নটা ব্যক্তি নয়, ব্যবস্থার ঝুঁকি নিয়ে। একটি আবাসিক পরিবেশে, যেখানে কিশোরী ও তরুণীরা ২৪ ঘণ্টা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকে, সেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি শিক্ষকের হাতে থাকে। এই অবস্থায় একজন পুরুষ শিক্ষকের উপস্থিতি যদি পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার মধ্যে না থাকে, তাহলে সেটি সহজেই অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে—যা সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে।
শিক্ষার পরিবেশ শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানসিক নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত স্বস্তি এবং বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একজন কিশোরী তার শারীরিক পরিবর্তন, স্বাস্থ্যগত সমস্যা, মানসিক চাপ বা আবাসিক জীবনের জটিলতা একজন নারী শিক্ষকের কাছে যত সহজে বলতে পারে, একজন পুরুষ শিক্ষকের কাছে তা পারে না। ফলে শিক্ষার স্বাভাবিক প্রবাহই বাধাগ্রস্ত হয়। এটি শুধু নিরাপত্তার নয়, শিক্ষার মানেরও প্রশ্ন।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। ইসলামে নারীর পর্দা ও শালীনতা রক্ষা ফরজ হিসেবে নির্ধারিত। সেখানে একটি প্রতিষ্ঠান যদি ইসলামী আদর্শ শেখানোর দাবি করে, তবে তার কাঠামোতেও সেই আদর্শের প্রতিফলন থাকা জরুরি। স্বামী ও মাহরাম ছাড়া অন্য পুরুষের সামনে অবাধ মেলামেশা সীমাবদ্ধ করার যে নীতি, সেটির সঙ্গে আবাসিক প্রতিষ্ঠানে পুরুষ শিক্ষকের সরাসরি তত্ত্বাবধান অনেকের কাছে সাংঘর্ষিক মনে হওয়া স্বাভাবিক। এই প্রশ্নের উত্তর কেবল তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় নয়, বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়েই খুঁজতে হবে।
সমস্যার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—নীরবতা ও ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতি। ভুক্তভোগীরা অনেক সময় লজ্জা, ভয় এবং সামাজিক চাপের কারণে মুখ খুলতে পারে না। পরিবারগুলোও প্রভাবশালী মহলের চাপে নীরব থাকে। এর ফলে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যায় এবং অন্যত্র গিয়ে আবারও একই অপরাধ করার সুযোগ পায়। এই চক্র ভাঙতে না পারলে কোনো নীতিই কার্যকর হবে না।
এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আবাসিক মাদ্রাসাগুলোর জন্য কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। যত্রতত্র অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা বন্ধ করতে হবে, শিক্ষক নিয়োগে যাচাই-বাছাই বাধ্যতামূলক করতে হবে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মহিলা মাদ্রাসাগুলোকে নারী শিক্ষক ও নারী কর্মচারী দ্বারা পরিচালিত করার নীতি কার্যকর করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানে এই নীতি লঙ্ঘিত হলে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগকারী পরিবারকে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দিতে হবে, যাতে তারা ভয় ছাড়া বিচার চাইতে পারে।
অভিভাবকদের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের নিরাপত্তা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠানের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। নিয়মিত যোগাযোগ, আচরণগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ এবং সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সমাজ এবং প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত দায়িত্ব। কিন্তু যখন বারবার প্রমাণ হয় যে সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তখন বিদ্যমান কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করাই স্বাভাবিক।
বারবার ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার পরও যদি কাঠামোগত পরিবর্তন না আসে, তবে প্রতিটি নতুন অভিযোগ শুধু একটি শিশুর নয়, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রমাণ হয়ে দাঁড়াবে। মহিলা মাদ্রাসাগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নীতিগত পরিবর্তন, কঠোর নজরদারি এবং নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা আর বিকল্প নয় এটি জরুরি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।