স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক
আমদানি-রপ্তানিসংশ্লিষ্ট প্রায় সব খাতে সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিকভাবে মাশুল ও ভাড়া বাড়ায় ব্যবসায়ীদের ব্যয়চাপ তীব্র হয়েছে। বেসরকারি কন্টেইনার ডিপো (আইসিডি), চট্টগ্রাম বন্দর, আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন, স্থল পরিবহন ও লাইটারেজ—প্রতিটি স্তরেই ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই অতিরিক্ত ব্যয়ের শেষ পর্যন্ত প্রতিফলন পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে, যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ধারাবাহিক মাশুল বৃদ্ধির ফলে পরিচালন ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে উঠছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অর্থনীতিতে নেতিবাচক হতে পারে।
চট্টগ্রামের ২১টি বেসরকারি কন্টেইনার ডিপোতে গত সাত মাসে দুই দফায় চার্জ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। সর্বশেষ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর কন্টেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ আরও ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ১৯ এপ্রিল বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্ত জানায়।
সংস্থাটির ভাষ্য, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ট্যারিফ সমন্বয় করা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া ট্যারিফে ৩০ থেকে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ বাড়ানো হয়েছিল।
বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, ‘গ্রাহকদের অবহিত করে ১৯ এপ্রিল থেকে নতুন হার কার্যকর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এটি মূলত বাড়তি ব্যয়ের সমন্বয়।’
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও ব্যয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ২৮ ফেব্রুয়ারির পর আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনে ভাড়া ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকাগামী রুটে। আগে যেখানে ২০ ফুটের একটি কন্টেইনার পাঠাতে খরচ হতো ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ ডলার, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ ডলারে।
একাধিক শিপিং এজেন্ট জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইনস্যুরেন্স ব্যয়, বাংকারিং সারচার্জ এবং পরিচালন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতি কন্টেইনারে অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৭০০ ডলার সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে। এমএসসি শিপিংয়ের হেড অব অপারেশন আজমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের জন্য কন্টেইনার বুকিং সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে নির্দেশনা এসেছে। এতে প্রতি সপ্তাহে ৮০০ থেকে ১ হাজার টিইইউস রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে।’
স্থল পরিবহন খরচও একইভাবে বেড়েছে। বন্দর থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহনে আগে যেখানে একটি ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানে খরচ হতো ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকায়, যা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান-প্রাইম মুভার মালিক সমিতির মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমদ বলেন, ‘জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের কারণে পরিবহন ভাড়া বেড়েছে।’
নদীপথেও ব্যয় বেড়েছে। লাইটারেজ জাহাজে পণ্য পরিবহনে ভাড়া ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, ফলে প্রতি টন পণ্যে খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০৫ টাকা, যা আগে ছিল ৫৫০ টাকা। বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ জানান, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ব্যবসায়ীদের আপত্তি সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে সব সেবা খাতে গড়ে ৪১ শতাংশ মাশুল বৃদ্ধি কার্যকর করে। এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। এতে প্রতিটি ২০ ফুট কন্টেইনারে গড়ে প্রায় ৩৯ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় যোগ হয়েছে। যদিও এই ব্যয়ের একটি অংশ শিপিং লাইন বহন করে, শেষ পর্যন্ত তা আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকের ওপর বর্তায় এবং পণ্যের মূল্যে প্রতিফলিত হয়।
ব্যবসায়ীদের মতে, সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে উৎপাদনমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে। কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য রপ্তানি—দুই ক্ষেত্রেই বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে। কারণ একই পণ্যে দুই দফায় বাড়তি মাশুল দিতে হচ্ছে।’
বিজিএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘বন্দর ও ডিপোর ট্যারিফ বৃদ্ধির চাপ সামাল দেওয়ার আগেই আন্তর্জাতিক শিপিং ভাড়া বেড়েছে। এতে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
একই সংগঠনের পরিচালক ও ক্লিপটন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী মহি উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘মাশুল ও পরিবহন ব্যয়ের চাপ, সঙ্গে বিদ্যুতের লোডশেডিং—সব মিলিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে গেছে। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে ব্যয় বৃদ্ধির ফলে শেষ পর্যন্ত এর পুরো চাপ ভোক্তার ওপরই বর্তাবে। এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।






