ফিয়াদ নওশাদ ইয়ামিন
রাজধানীতে কোরবানির পশুর হাট নিয়ে বিরোধ উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। সিটি করপোরেশনের ইজারা না পাওয়া হাটগুলো একে একে বিলুপ্ত হওয়ার পথে এমন বাস্তবতা সামনে আসতেই একটি গভীর প্রশ্ন জাগে আমরা কি সত্যিই সমস্যার সমাধান করছি, নাকি একটি প্রয়োজনীয় সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থাকেই সংকুচিত করে ফেলছি? অবৈধ হাট এই একটি শব্দের আড়ালে যে আয়োজনটি লুকিয়ে আছে, সেটি কেবল একটি বাজার নয়; এটি একটি ধর্মীয় উৎসবের প্রাণ, মানুষের বিশ্বাসের অংশ, এবং বহু মানুষের জীবিকার একমাত্র ভরসা।
বনশ্রী সোসাইটির প্লট মালিকদের নেতৃবৃন্দ হাটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করলে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন একাধিক অস্থায়ী হাট ঝুঁকিতে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মেরাদিয়া ও আফতাবনগরসহ কয়েকটি এলাকায় প্রতিবছর ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে পাঁচ থেকে সাত দিনের জন্য অস্থায়ী হাট বসে। তবে সিটি করপোরেশনের ইজারা না থাকা এবং পরিবেশগত আপত্তির কারণে এসব হাট বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
হাট বন্ধ হলে দক্ষিণ বনশ্রী, রামপুরা, খিলগাঁও, বাসাবো, বাড্ডা ও গুলশান এলাকার বাসিন্দাদের পশু সংগ্রহে সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত বছর এসব এলাকায় হাট না থাকায় অনেককে দূরবর্তী এলাকায় গিয়ে পশু কিনতে হয়েছে, এতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং বয়স্ক অসুস্থ রোগীদের পশু কিনতে কষ্ট হয়েছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ভাটারা-মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজার এলাকায় হাট স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক খামারি, পরিবহন শ্রমিক ও মৌসুমি ব্যবসায়ী আয় করে থাকেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, হাট সীমিত বা বন্ধ হলে তাদের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং বাজারে পশুর সরবরাহেও চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ দেশে অর্থনৈতিক একটা বড় পরিবর্তন আসে কোরবানি হাট ও এ সংক্রান্ত ব্যবসার মাধ্যমে।
হাট বন্ধের আশঙ্কার মধ্যে কিছু বড় এগ্রোফার্ম বাজারে প্রচার বাড়িয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। খোলা বাজার সংকুচিত হলে সীমিত সংখ্যক বিক্রেতার হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে, এতে পশুর দামে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মেরাদিয়া এলাকার বাসিন্দা ইব্রাহিম খলিল এ প্রসঙ্গে বলেন, নগরের বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ীভাবে মেলা, মিছিল, কনসার্ট বা ধর্মীয় আয়োজনের কারণে জনদুর্ভোগ তৈরি হলেও সেগুলো সবসময় একই ধরনের নিয়ন্ত্রণের মুখে পড়ে না। তার মতে, কোরবানির হাটের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি কঠোরতা দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, পরিবেশগত বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবছর আদালতে রিট করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে হাট আয়োজন অনিশ্চয়তায় পড়ে। তবে এ বিষয়ে রিটকারীদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, নির্ধারিত স্থান, সীমিত সময়, আইনশৃঙ্খলা তদারকি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে অস্থায়ী হাটগুলো সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। তাদের মতে, পরিকল্পিত সমন্বয়ের অভাবই বর্তমান সংকটের মূল কারণ।