চলমান সংঘাতে ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে এ ধরনের হামলার কোনো কারণ নেই।
সাংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প ওই প্রশ্নটিকে ‘বোকা’সুলভ বলে উড়িয়ে দেন। তিনি যুক্তি দেখান যে ইরান ইতোমধ্যে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কেন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে যাবে—উলটো সেই প্রশ্ন তোলেন।
ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হামলা চালানোর কোনো কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নেই।
‘ইরান পুরোপুরি পরাজিত হয়েছে, কেন আমি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করব?’—এই মন্তব্য করে তিনি তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন যে বর্তমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার অযৌক্তিক।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান বিরোধ এবং নতুন করে সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্কের এই প্রেক্ষাপট সামনে এল।
ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভালো এবং এই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়ে যাতায়াত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্প্রতি জানানো হয়েছে যে মার্কিন সুরক্ষাবলয়ের অধীনে থাকা রুটটিতে জাহাজের চলাচল বাড়ছে। যদিও বাণিজ্যিক জাহাজের সঠিক সংখ্যা এবং এর সুরক্ষার পরিধি নিয়ে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে। এর আগে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে যে কিছু রাতে ২০ থেকে ৩০টি ট্যাংকার এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানকে একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবেও অভিহিত করেছেন। তিনি দাবি করেন, দেশটির মূল্যস্ফীতি ৩৫০ শতাংশে পৌঁছেছে এবং সৈন্যদের বেতন দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থও তাদের নেই। তবে তিনি যোগ করেন যে এই আর্থিক সংকট যুক্তরাষ্ট্রকে ভবিষ্যৎ সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারবে না।
তিনি ইঙ্গিত দেন যে, ওয়াশিংটন পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং পরবর্তীতে কী ঘটে, তা সময়ই বলে দেবে।
এদিকে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সীমিত ও পর্যায়ক্রমে সামরিক হামলার একটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রস্তাবিত পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালানোর মতো ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুনরায় গড়ে ওঠার পথ বন্ধ করা।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) কৌশলগত এই জলপথে জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে—এমন ইরানি অবকাঠামো ও স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে।
এই সীমিত হামলার উদ্দেশ্য হলো ইরানের রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত করা। মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এই সিস্টেমগুলো পুনর্নির্মাণ করা হলে তেহরান বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানো এবং হরমুজ প্রণালির নৌচলাচল ব্যাহত করার ক্ষমতা ফিরে পাবে।
তাই ইরানবিরোধী কোনো বড় ধরনের অভিযানের চেয়ে মূলত নিরাপদ নৌপথ বজায় রাখার ওপরই এই সম্ভাব্য অভিযানটি চালিত হবে।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে সীমিত হামলা চালানোর সম্ভাবনার বিষয়ে ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই পরিকল্পনাকে সমর্থন করেছেন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি, সেন্ট্রাল কমান্ড অপারেশনাল প্রস্তাবটি তৈরি করে হোয়াইট হাউসকে পর্যায়ক্রমে হামলার সম্ভাবনার বিষয়ে অবহিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে হরমুজ প্রণালিই মূল কেন্দ্রবিন্দু
আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
এই জলপথে নৌচলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে কাজ করে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে, জাহাজে হামলা চালানোর এবং রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা পুনর্নির্মাণের ইরানের সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রণালির আশপাশে ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে সম্প্রতি মার্কিন সামরিক বাহিনী অভিযান চালিয়েছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল সহজ করতে ওয়াশিংটন সুরক্ষিত শিপিং রুটও ব্যবহার করছে।
সর্বশেষ এই পরিস্থিতিগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, ট্রাম্প পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা খারিজ করলেও, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হুমকি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র এখনো প্রচলিত সামরিক পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছে।