ক্রীড়া প্রতিবেদক
দুপুরে পূর্বাচলে গিয়েছিলেন মাঠ পরিদর্শন করতে। গ্রাউন্ডস কমিটির চেয়ারম্যান খালেদ মাসুদ পাইলটকে সঙ্গে নিয়ে মাঠ দেখে ফিরে এসেছিলেন মিরপুরে। সাতজন পরিচালককে নিয়ে আজ যাওয়ার কথা ছিল বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে। ওই ভেন্যুতেই যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের সঙ্গে মাঠ উন্নয়ন নিয়ে সমন্বিতভাবে আলোচনা করার কথা ছিল আমিনুল ইসলাম বুলবুলের। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ায় বুলবুলের আর বগুড়া সফর হলো না। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীও বাতিল করেছেন পূর্বনির্ধারিত সফরটি। কারণ, দুজনের পথ বেঁকে গেছে। গতকাল মঙ্গলবারই সাবেক সভাপতি হয়ে গেছেন অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী আমিনুল ইসলাম বুলবুল।
বিসিবির নির্বাচনে অনিয়ম খুঁজে পাওয়ায় বুলবুলের কমিটি ভেঙে দিয়ে গতকাল ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। নতুন সেই কমিটির সভাপতি করা হয়েছে জাতীয় দলের আরেক সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালকে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দায়িত্ব বুঝে নিয়ে প্রথম সভাও করেছেন তিনি। বিসিবির ইমেজ পুনরুদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন তামিম। তবে বুলবুল এনএসসির এ পদক্ষেপ মেনে নেননি। তাদের প্রতিবেদনকে ত্রুটিপূর্ণ, খামখেয়ালি এবং আইনত অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। পাশাপাশি নিজেকেই বিসিবির একমাত্র বৈধ সভাপতি দাবি করেছেন। তাঁর মতে, নির্বাচিত পরিচালক পর্ষদের বিলুপ্তি এবং তামিম ইকবালের নেতৃত্বে অ্যাডহক কমিটি গঠন একটি ‘সাংবিধানিক অভ্যুত্থান’। আমিনুলের নেতৃত্বে পরিচালনা পর্ষদকে এনএসসি ভেঙে দেওয়ার পর গতকাল রাতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলেন তিনি। একই সঙ্গে আইসিসির হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তিনি দাবি করেন, গত ৫ এপ্রিল এনএসসির দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদন আইনগতভাবে কোনো ভিত্তি রাখে না। ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বিসিবি নির্বাচন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও বৈধ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছে। নতুন অ্যাডহক কমিটি বিসিবির কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবে। তিন মাসের মধ্যে নির্বাচিত কমিটির হাতে ক্ষমতা বুঝিয়ে দেবে তারা। সেই নির্বাচিত কমিটির সভাপতিও হতে পারেন তামিম ইকবাল। কারণ, বিসিবির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী অ্যাডহক কমিটির সদস্যরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। তামিম বলেন, ‘আমাদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সহায়তা করার। আমরা চেষ্টা করব এই কাজ দ্রুত এবং সৎভাবে সম্পন্ন করতে।’ তামিম ইকবালের নেতৃত্বাধীন কমিটিতে বিএনপির তিন নেতার ছেলে ও এক নেতার স্ত্রী স্থান পেয়েছেন। কমিটির সদস্যরা হলেন সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাসের ছেলে মির্জা ইয়াসির, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের ছেলে সৈয়দ ইব্রাহিম আহমেদ, অর্থমন্ত্রী আমির খসরুর ছেলে ইসরাফিল খসরু, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের স্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাশনা ইমাম, জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার ও আন্তর্জাতিক ধারাভাষ্যকার আতহার আলী খান, বিসিবির সাবেক পরিচালক ও প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান তানজিল চৌধুরী, বিসিবির সাবেক কর্মকর্তা সালমান ইস্পাহানী, বিসিবির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বাবু ও সাবেক পরিচালক ফাহিম সিনহা।
২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বিসিবির নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ঢাকার ৪৫টি ক্লাব অসহযোগ আন্দোলনে নেমেছিল আমিনুল ইসলামের বোর্ডের বিরুদ্ধে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নির্বাচিত কমিটিকে তামিম ইকবালও অবৈধ বলেছিলেন। ‘বিতর্কিত’ নির্বাচনের অনিয়ম তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ক্লাব, জেলা-বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা চিঠি দিয়েছিলেন এনএসসিকে। সংগঠকদের আবেদন আমলে নিয়ে এনএসসি পাঁচ সদস্যের স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সব পক্ষের সাক্ষাৎকার নিয়ে কমিটি এক হাজার পাতার প্রতিবেদন জমা দেয় ৫ এপ্রিল।
ওই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আমিনুল ইসলামের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে অ্যাডহক কমিটি গঠন করে এনএসসি। আগের কমিটি ভেঙে দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এনএসসির ক্রীড়া পরিচালক আমিনুল এহসান বলেন, ‘কমিটির রিপোর্ট পর্যালোচনা করে এই অবস্থানে উপনীত হয়েছে যে বর্তমান বিসিবি কমিটি গঠনে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণের দুর্বলতা ছিল, অনিয়ম ছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এনএসসি এরই মধ্যে বিশ্ব ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির কাছে একটি ইমেইল পাঠিয়েছে। সেই ইমেইলে এই কমিটি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।’ তিনি জানান, ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি সম্পর্কেও আইসিসিকে অবহিত করা হয়েছে। আইসিসির কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী তারা।
তদন্তে জেলা বা বিভাগীয় সভাপতিদের ওপর সরকারি কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ ছিল বলে জানান এনএসসি ক্রীড়া পরিচালক। বিশেষ ছকে এনএসসির কর্মকর্তারা এবং সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার এপিএস সাইফুল ইসলামের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাউন্সিলর হিসেবে মনোনয়ন করার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ভোটের ফল প্রভাবিত করার জন্য সুসংগঠিত প্রচেষ্টা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে বলে জানান তিনি। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ অযৌক্তিকভাবে হস্তক্ষেপ করেছেন বলেও রিপোর্টে লেখা হয়েছে। এই ক্রীড়া পরিচালকের মতে, অনিয়মের তালিকা বড় হওয়ার কারণে বুলবুলের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অনিয়ম করার অভিযোগ তুলে আমিনুল এহসান বলেন, ‘বিসিবির সংবিধানের অনুচ্ছেদের ৯.৩.৩ অনুযায়ী সভাপতি এককভাবে ১০ জন সাবেক ক্রিকেটারকে কাউন্সিলর মনোনয়নের ক্ষমতা রাখেন না। আমিনুল ইসলাম এককভাবে ১০ জন সাবেক ক্রিকেটারকে কাউন্সিলর হিসেবে মনোনয়ন করে সভাপতির ক্ষমতার বাইরে কাজ করেছেন। এটি সুস্পষ্ট ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিসিবির সংবিধানের লঙ্ঘন।’ বিসিবি সভাপতি, সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা ও তাঁর এপিএস সাইফুল ইসলাম সমন্বিতভাবে ই-ভোটিং প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং কারচুপির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বলে জানান এনএসসি পরিচালক।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে বিসিবি। দেড় বছরের কিছুটা বেশি সময়ের তিনবার বিসিবি সভাপতি পরিবর্তন হলো। ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট এনএসসি কোটায় পরিচালক ও সভাপতি নির্বাচিত হন ফারুক আহমেদ। দেশের প্রথম ক্রিকেটার সভাপতি ছিলেন তিনি। পরিচালক ও উপদেষ্টার সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে ৯ মাসের মাথায় সভাপতির পদ থেকে বহিষ্কার করা হয় ফারুক আহমেদকে। ২০২৫ সালের ৩০ মে আমিনুল ইসলাম বুলবুল হন সভাপতি। তিনিও এনএসসি কোটায় পরিচালক ও সভাপতি হন। একই বছরের ৬ অক্টোবর নির্বাচন করে পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হন তিনি। ওই বোর্ডে ক্লাব ক্যাটেগরি থেকে পরিচালক ও সহসভাপতি হয়েছিলেন ফারুক আহমেদ। এই কমিটির বিরুদ্ধে নির্বাচন প্রভাবিত করার তদন্ত হওয়ায় সাতজন পরিচালক পদত্যাগ করেছিলেন।