রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্ধারিত দামের তুলনায় প্রতি সিলিন্ডারে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। অনেকের অভিযোগ, বাজারে সরবরাহ সংকটের কথা বলা হলেও এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা ব্যাখ্যা নেই।
লালবাগের বাসিন্দা সোহেল আরমান বলেন, “আজ ২ হাজার ১৫০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনেছি। গত মাসে কিনেছিলাম প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকায়। সরকারি দামে কখনোই কিনতে পারি না। তাহলে এই দাম নির্ধারণের বাস্তবতা কোথায়?”
খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য, তারা ডিলার পর্যায় থেকেই বেশি দামে এলপিজি সংগ্রহ করছেন।
আজিমপুরের এক বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের বলা হচ্ছে সরবরাহ কম। তাই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। আমরা তো ওপরের দামের ওপরই নির্ভরশীল।”
টঙ্গীর এক ব্যবসায়ী জানান, বর্তমানে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। তার দাবি, সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে।
অন্যদিকে কুমিল্লা জেলার এক ব্যবসায়ী নেতা বলেন, কোম্পানি পর্যায় থেকেই দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে তাদের ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এতে খুচরা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
এ পরিস্থিতির জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ব্যর্থতাকেই দায়ী করছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা প্রফেসর ড. শামসুল আলম।
তিনি বলেন, ‘এসব অনিয়ম প্রতিরোধ করার দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের। তারা এখন পর্যন্ত একজনেরও লাইসেন্স বাতিল করেনি। প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিদপ্তর এ সব প্রতিষ্ঠান যেখানে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে তার মানে সরকার নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বিইআরসির বিরুদ্ধে অনাস্থা দিয়ে রেখেছি, তাদের আমরা বয়কট করেছি। আজ সরকার সে জায়গায় পরিবর্তন আনেনি যে সব অলিগার্কে (গুটিকয়েক সম্পদশালী ব্যবসায়ীর একটি গোষ্ঠী) পরিণত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই এ প্রক্রিয়াটা আরও বেশি হয়েছে। তারা এসব অবস্থাকে উসকে দিয়েছে এবং অসাধু বাজার ব্যবস্থা জ্বালানি খাতে আরও বেশি প্রতিষ্ঠিত করেছে।’
‘এখনো যদি সরকার না বোঝে লোক বদলিয়ে এসবের প্রতিকার করতে হবে। এসব প্রতিকার করার দায়িত্ব সরকারের। মানে প্রতিযোগিতা কমিশন, বিইআরসি, ভোক্তা অধিদপ্তর, বিএসটিআই— এরা সবাই সবার জায়গা থেকে যদি এগুলো প্রোটেক্ট করে এবং যারা এভাবে অসাধু ব্যবসা করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। তাদের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে।’
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘বাজার থেকে অসাধু ব্যবসায়ীদের উৎখাত করতে হবে। দরকার হলে আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে লাইসেন্স নতুন করে দিতে হবে। এই ব্যবসা কারও ব্যক্তিগত কোনো ব্যবসা না। পৈতৃক ব্যবসাও না। এই ব্যবসা করার জন্য রাষ্ট্র তাদের দাসখত লিখে ব্যবসা করতে দেয়নি যে তারা যত খুশি দাম বাড়াবে, ইচ্ছামতো বিক্রি করবে এবং তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে না।’
অন্যদিকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘মার্চ মাসে ১ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন এলপিজির সাপ্লাই হয়েছে। এটি অন্য মাসের তুলনায় সর্বোচ্চ। সাপ্লাই নিয়ে টেনশনের কিছু নেই।’
তিনি বলেন, ‘প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়। আমরা সঙ্গে সঙ্গেই জেলা প্রশাসক, ভোক্তা অধিদপ্তরকে জানিয়ে দেই। দাম যাতে বেশি নিতে না পারে সেজন্য লোয়াবও সক্রিয়। দাম বাড়ার বিষয়টি আমাদের মনিটরে রাখতে হবে, আমি উচ্চ পর্যায়ে এ বিষয়ে কথা বলবো।’
তবে বাজার বাস্তবতা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। নির্ধারিত মূল্য ও খুচরা দামের এ ব্যবধান অব্যাহত থাকলে ভোক্তা আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।






