চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমান’কে প্রকাশ্যে টেনেহিঁচড়ে মারধর করার অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও ছাত্ররাজনীতির বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে উঠে এসেছে—রোমানকে যেভাবে প্রকাশ্যে হেনস্তা করা হয়েছে, তা কেবল ব্যক্তিগত অভিযোগ বা পূর্বের রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে নয়; বরং নিয়োগকে ঘিরে চলমান দ্বন্দ্ব, ক্যাম্পাস ক্ষমতার হিসাব এবং বিশেষ করে ‘শিবিরঘনিষ্ঠ’ প্রভাববলয় শক্তিশালী করার অভিযোগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রতিক্রিয়া—এমন সন্দেহও তৈরি হয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপটে গত ১১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যেসব নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে—সেগুলো সম্পর্কে প্রশাসনের পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। মানববন্ধনে চাকসু হল সংসদের নেতারা, ইসলামী ছাত্র মজলিস, ছাত্র অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনাসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ইসলামী ছাত্র মজলিসের সভাপতি সাকিব মাহমুদ রুমি বলেন, “আমরা পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি প্রশাসন ৪১১ জন শিক্ষক, কর্মচারী ও কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে। আমরা জানতে চাই এদের কেন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং কোন প্রক্রিয়া অবলম্বন করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।”
এই নিয়োগ বিতর্ক নতুন নয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতারের প্রশাসন গত ১৫ মাসে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে অন্তত ২৫০ জনকে নিয়োগ দিয়েছে এবং আরও অন্তত ৩০৪ জনকে নিয়োগ দিতে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে—নিয়োগপ্রক্রিয়া ‘তড়িঘড়ি’ সম্পন্ন করা হয়েছে এবং “মূলত একটি গোষ্ঠীর লোক নিয়ে দল ভারী করা হচ্ছে।” জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান চৌধূরীর বক্তব্য ছিল, “নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে তড়িঘড়ি করে। মূলত একটি গোষ্ঠীর লোক নিয়ে দল ভারী করা হচ্ছে। সাধারণ নিয়োগপ্রার্থীরা সুযোগ পাচ্ছেন না। বিষয়গুলো ইউজিসির খতিয়ে দেখা উচিত।”
অন্যদিকে উপাচার্য মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “আমরা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করছি। এখন লিখিত, মৌখিক ও প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে নিয়োগ হচ্ছে।” ইউজিসির চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজের বক্তব্যও উদ্ধৃত হয়েছে—নিয়োগে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে, তবে নিয়ম মেনে নিয়োগ দিতে বাধা নেই।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই সম্প্রতি ফাইন্যান্স বিভাগে প্রভাষক পদে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক শামীম উদ্দিন খানের মেয়ে মাহিরা শামীমের নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া নিয়ে বিতর্ক ছড়ায়। সংবাদে বলা হয়, আবেদনকারীদের তালিকায় তুলনামূলকভাবে কম সিজিপিএ থাকা সত্ত্বেও তাঁর নিয়োগ অনুমোদন দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য শামীম উদ্দিন খান বলেছেন, “ফাইন্যান্স বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমি কোনোভাবেই যুক্ত ছিলাম না। আমি এই নিয়োগ বোর্ডের সদস্য নই। বোর্ড কীভাবে হয়েছে, সেটিও আমার জানা নেই।” উপাচার্যও বলেন, তিন ধাপের যাচাই-বাছাই—লিখিত, ডেমনস্ট্রেশন ও মৌখিক—অনুসরণ করে নিয়োগ হচ্ছে এবং “স্বজনপ্রীতি বা পক্ষপাতিত্বের কোনো সুযোগ নেই।”
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে আরও কিছু অভিযোগও সামনে আনা হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে—ফাইন্যান্স বিভাগের জামায়াতপন্থি শিক্ষক বেগম ইসমত আরার সন্তান হাসান মোহাম্মাদ রাফি শিক্ষক হয়েছেন।
আবার চবি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার সাইফুল ইসলামের ভাই মো. আবদুল কাইয়ুম নিয়োগ পেয়েছেন—এ ঘটনাও সমালোচনায় এসেছে।
এসব তথ্যের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আলাদা কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা তদন্ত প্রতিবেদন এই প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
ঠিক এই প্রেক্ষাপটে আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদকে ভর্তি পরীক্ষা চলাকালে প্রকাশ্যে হেনস্তার ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত শনিবার দুপুরে চাকসুর কয়েকজন নেতা পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে শিক্ষককে তাড়া করে নিয়ে যান। ১ মিনিট ৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে শিক্ষককে কয়েকজন ছাত্র টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন দেখা যায়।
ভিডিওতে চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন, পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ, আইন ও মানবাধিকার–বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি এবং নির্বাহী সদস্য সোহানুর রহমানকে দেখা গেছে। ওই অবস্থায় তাঁকে একটি অটোরিকশায় তুলে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে প্রক্টরের কার্যালয়ে ৭ ঘণ্টা এবং সহ-উপাচার্যের কার্যালয়ে ২ ঘণ্টাসহ মোট ৯ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এ সময় শিক্ষকের মুঠোফোন তল্লাশির অভিযোগও এসেছে। রাত ৯টার দিকে প্রক্টরের গাড়িতে করে তাঁকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে নেওয়া হয়।
ঘটনার পর শিক্ষকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ নিন্দা জানান।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আর রাজী ফেসবুকে লেখেন, “সম্মতি ছাড়া কাউকে জোর করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া অপহরণ। অপরাধী হলেও কোনো শিক্ষক বা কোনো মানুষকে জোরপূর্বক কোথাও নিয়ে যাওয়ার অধিকার কারও নাই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমানের সঙ্গে যা করা হয়েছে, তার তীব্র নিন্দা জানাই।”
ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জি এইচ হাবীবও হেনস্তার ভিডিও শেয়ার করে লিখেছেন, “একজন শিক্ষক ও বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি এই আগ্রাসী ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।” তিনি বলেছেন, অভিযোগের সত্যতা থাকতে পারে, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যায় না—তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় এমন পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।
চাকসুর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আইয়ুবুর রহমানও নিন্দা জানিয়ে বলেন, তিনি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পক্ষে নন এবং শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে চাকসুর উচিত ছিল প্রশাসনের অনিয়ম, শিক্ষক নিয়োগ ও স্বজনপ্রীতির মতো বিষয়গুলোয় অবস্থান নেওয়া।
তিনি বলেন, প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনলে অভিযুক্ত অন্য শিক্ষকদের বিচারও নিশ্চিত করা যেত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামও বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে প্রকাশ্যে হেনস্তা, টেনেহিঁচড়ে প্রক্টর কার্যালয়ে সোপর্দ এবং ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া গভীর উদ্বেগজনক; ভিন্নমত বা অভিযোগ থাকলেও নিষ্পত্তির একমাত্র পথ আইন ও প্রশাসনিক তদন্ত—“কোনোভাবেই মব জাস্টিস নয়।” বিবৃতিতে আরও বলা হয়, একটি বিশেষ ছাত্রসংগঠন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনে জয়লাভের পর ক্যাম্পাসে মব সংস্কৃতি ও শিক্ষক নিপীড়নের প্রবণতা বাড়ছে—এটি উদ্বেগজনক; দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা চাওয়া হয়।
অন্যদিকে চবির রাজনীতির ভেতর থেকে এই ঘটনাকে ঘিরে পাল্টা ব্যাখ্যাও আসছে। চকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় একটি দীর্ঘ বক্তব্যে দাবি করেন, “গতকাল আওয়ামীপন্থি শিক্ষক রোমান সাহেবকে ধরে একটা নাটক মঞ্চায়ন করা হয়েছে… বিচার-বিশ্লেষণ এবং প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায়িত্ব চবির শিক্ষার্থীদের উপর ছেড়ে দিলাম।”
তিনি আরও বলেন, যে ব্যক্তি ওই ঘটনার নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনি শিবিরের একজন দায়িত্বশীল এবং বর্তমানে আইন সম্পাদক—এমন দাবি তুলে প্রশ্ন তোলেন, অভিযুক্ত শিক্ষকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে থাকলে সহযোগী হওয়ার দায় এড়ানো যায় কি না।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন ফেসবুকে নিয়োগ বিতর্ক প্রসঙ্গে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রো-ভিসি তার ক্ষমতা ব্যবহার করে রেজাল্টে এগিয়ে থাকা ১১ জনকে বঞ্চিত করে তার নিজ কন্যাকে নিয়োগ দিয়েছেন… ইনসাফ কোথায় গেল?”
তিনি আরও বলেন, “একটি দেশের শ্রেষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো বিশ্ববিদ্যালয়… আর যারা সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং একই সাথে প্রশাসক তাদেরতো নৈতিকতা অনেক উপরে থাকার কথা… এইসব অন্যায় দেখে দেখে ক্লান্ত।”
শিক্ষক হেনস্তার ঘটনায় যারা জড়িত—তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি, গোষ্ঠীগত প্রভাব বা ‘শিবিরপন্থি নিয়োগ’—এমন অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত আদৌ হবে কি না। কারণ শিক্ষকদের একটি অংশ বলছে—নিয়োগের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুললেই ‘মব’ দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ ভেঙে পড়বে।
আবার আরেক অংশ বলছে—অভিযোগের বিচার প্রশাসনিক তদন্তেই হতে হবে, প্রকাশ্য হেনস্তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।






