ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে মনোনয়নপত্র যাচাই–বাছাই ও আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দুই দলই বলেছে, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হয়নি এবং নির্বাচনী প্রশাসন বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান এবং এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া।
ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, তুচ্ছ ও সংশোধনযোগ্য কারণে তাঁদের একাধিক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে, যা নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন আগে জানিয়েছিল ছোটখাটো সংশোধনযোগ্য ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ দিয়ে মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা হবে। কিন্তু বাস্তবে সেটি মানা হয়নি।
তিনি আরও জানান, তাঁদের এক প্রার্থীর এক মাসের বিদ্যুৎ বিল এক হাজার টাকার কম বকেয়া থাকায় মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। আরেক প্রার্থীর ক্ষেত্রে ব্যাংকে নতুন হিসাব খোলা ও স্টেটমেন্ট জমা দেওয়ার পরও শুধু হিসাব খোলার তারিখ উল্লেখ না থাকায় মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এছাড়া কোথাও এক–দুটি স্বাক্ষর না থাকা কিংবা সামান্য ক্লারিক্যাল ভুলের কারণেও মনোনয়ন বাতিল হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। ঋণখেলাপি হওয়া, মামলা থাকা, তথ্য গোপন বা সম্পদের বিবরণ না দেওয়ার মতো গুরুতর কারণে মনোনয়ন বাতিল হলে তা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু সহজেই সমাধানযোগ্য বিষয়কে কারণ দেখিয়ে মনোনয়ন বাতিল করা অনিয়মের শামিল। তাঁর অভিযোগ, কিছু প্রার্থীর ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হলেও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বৈষম্য তৈরি করছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ২৮ শতাংশের বেশি প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এতে প্রার্থীদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অপ্রয়োজনীয় হয়রানি তৈরি হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বৈঠকে আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগের কথা জানান ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ৭০ শতাংশ উদ্ধার হয়েছে, তবে এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের গতি আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।এছাড়া তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হয়নি। কিছু রাজনৈতিক দল বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাচ্ছে এবং কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতারা ভিভিআইপি প্রটোকল সুবিধা পাচ্ছেন, যা জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায়।
একই দিনে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া বলেন, নির্বাচন কেন্দ্রিক আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি হতাশাজনক এবং নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে শঙ্কা বাড়ছে। তাঁর অভিযোগ, দেশের প্রশাসনিক কাঠামো বিএনপির দিকে হেলে পড়েছে।
তিনি বলেন, “যাচাই–বাছাইয়ের সময় বিধিভঙ্গের বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। আমরা চাই না নির্বাচন একতরফা হোক।” তিনি আরও বলেন, তফসিল ঘোষণার পরদিনই জামিনে বের হওয়া একজন চিহ্নিত আসামির হাতে তাঁদের এক সহযোদ্ধা নিহত হওয়ার ঘটনা নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
এনসিপি মুখপাত্র এনএসআই প্রধানের বিএনপি পার্টি অফিসে গিয়ে তারেক রহমানের সাক্ষাৎকার নেওয়ার ঘটনাকেও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসন দেশে ফেরার পর নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা একটি দলের অফিসে গিয়ে এ ধরনের আচরণ দেখানো বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। তিনি এ বিষয়ে সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
আসিফ মাহমুদ আরও বলেন, জাতীয় পার্টিকে এনসিপি নির্বাচনে দেখতে চায় না। তাঁর ভাষায়, “ফ্যাসিবাদের দোসর এবং যারা তাদের সহযোগিতা করেছে, তাদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন আমরা চাই না।” এ বিষয়ে বিধি অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ব্যবস্থা নেবে বলে এনসিপি প্রতিনিধি দলকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
আপিল নিষ্পত্তিতে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব দেখা গেলে এনসিপি আন্দোলনে নামবে বলেও ঘোষণা দেন দলের মুখপাত্র। তিনি বলেন, “যদি কোনো একটি দল বা গোষ্ঠীর প্রতি দুর্বলতা দেখিয়ে আগের নির্বাচনের মতো আয়োজন হয়, তাহলে নির্বাচনের পর পর্যন্ত বসে থাকব না—আগেই আন্দোলন করব।”
নির্বাচন নিয়ে জনগণের উৎসাহেও ভাটা পড়েছে বলে মন্তব্য করেন এনসিপি মুখপাত্র। ইসলামী আন্দোলন ও এনসিপির এই অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।