তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
মহাবিশ্বে আমাদের সৌরজগতের বাইরে প্রথম গ্রহ আবিষ্কারের পর থেকেই একের পর এক বিস্ময় উপহার দিচ্ছে তথাকথিত এক্সোপ্ল্যানেট বা বহিঃগ্রহগুলো। তবে এবার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ যে গ্রহটির সন্ধান দিয়েছে, সেটিকে বিজ্ঞানীরা বলছেন—এখন পর্যন্ত দেখা সবচেয়ে অদ্ভুত গ্রহগুলোর একটি।
নতুন এই বহিঃগ্রহটির নাম পিএসআর জে২৩২২-২৬৫০বি। এর আকৃতি গোল নয়, বরং লেবু বা আমেরিকান ফুটবলের মতো ডিম্বাকার। শুধু আকৃতিই নয়, এর বায়ুমণ্ডলও এমন রকম, যা আগে কোনও গ্রহে দেখা যায়নি।
এই গ্রহটি ঘুরছে একটি মৃত নক্ষত্রের চারপাশে—যাকে বলা হয় পালসার। পালসারটি প্রবল বিকিরণ ছুড়ে দেয় মহাকাশে, ঠিক যেন একটি মহাজাগতিক বাতিঘর। সাধারণত এ ধরনের পালসার তার সঙ্গী নক্ষত্রকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে ফেলে। এ কারণেই এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘ব্ল্যাক উইডো পালসার সিস্টেম’।
পালসারকে কেন্দ্র করে গ্রহ ঘোরার ঘটনা নতুন নয়। ১৯৯২ সালে আবিষ্কৃত প্রথম বহিঃগ্রহ দুটিও পালসারকে কেন্দ্র করেই ঘুরছিল। কিন্তু পিএসআর জে২৩২২-২৬৫০বি–কে আলাদা করে তুলেছে তার অস্বাভাবিক গঠন ও বায়ুমণ্ডল।
কার্নেগি আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটস ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী পিটার গাও বলেন, “এই তথ্য আমাদের জন্য পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল। ডেটা হাতে পাওয়ার পর আমরা সবাই বলেছিলাম—‘এটা আসলে কী?’”
কার্বন-হিলিয়ামে ভরা অদ্ভুত বায়ুমণ্ডল
এই গ্রহটির বায়ুমণ্ডলে প্রায় কোনও পানি, মিথেন বা কার্বন ডাই অক্সাইড নেই। বরং সেখানে আধিপত্য করছে হিলিয়াম ও বিশুদ্ধ কার্বন। বিজ্ঞানীদের ধারণা, সেখানে কার্বনের কণা জমে কালো ধোঁয়ার মতো মেঘ তৈরি হয়, যা থেকে হীরার মতো কণা বৃষ্টি হয়ে পড়তে পারে।
গ্রহটি তার পালসার থেকে মাত্র ১৬ লাখ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে—পৃথিবীর সূর্য থেকে দূরত্বের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ কাছাকাছি। ফলে মাত্র ৮ ঘণ্টায় একবার এটি তার কক্ষপথ সম্পন্ন করে।
পালসারের তীব্র মাধ্যাকর্ষণের কারণে গ্রহটির ভেতরে প্রবল জোয়ার-ভাটার মতো টান সৃষ্টি হয়। এর ফলেই গ্রহটি গোল না হয়ে চ্যাপ্টা ও লম্বাটে আকার ধারণ করেছে।
দিন-রাতের ভয়াবহ তাপমাত্রা
গ্রহটি টাইডালি লকড, অর্থাৎ এর এক পাশ সবসময় পালসারের দিকে মুখ করে থাকে। সেই পাশের তাপমাত্রা পৌঁছায় প্রায় ৩ হাজার ৭০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (২,০৪০° সেলসিয়াস)। অন্য পাশটি তুলনামূলক ঠান্ডা হলেও তাপমাত্রা নেমে আসে মাত্র ১ হাজার ২০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৬৫০° সেলসিয়াস)।
এই তাপমাত্রায় সাধারণত কার্বন অন্য মৌলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু এখানে কার্বন আলাদা অবস্থায় টিকে আছে, যা ইঙ্গিত দেয়—গ্রহটির বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন প্রায় নেই।
এখন পর্যন্ত গবেষণা করা প্রায় ১৫০টি বহিঃগ্রহের মধ্যে একটিতেও এমন বিশুদ্ধ কার্বনভিত্তিক বায়ুমণ্ডল পাওয়া যায়নি।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও দলনেতা মাইকেল ঝ্যাং বলেন, “এই গ্রহটি কোনো পরিচিত গ্রহ গঠনের প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়নি। এর রাসায়নিক গঠন সব পরিচিত তত্ত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।”
সৃষ্টি রহস্য এখনও অমীমাংসিত
একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গ্রহটির অভ্যন্তরে কার্বন ও অক্সিজেন ঠান্ডা হয়ে স্ফটিক আকারে জমে যায়। বিশুদ্ধ কার্বন উপরের দিকে উঠে এসে হিলিয়ামের সঙ্গে মিশে যায়। কিন্তু কীভাবে অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন প্রায় সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে গেল—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রজার রোমানি বলেন, “সব প্রশ্নের উত্তর না জানা থাকাটাই বিজ্ঞানের সৌন্দর্য। এই গ্রহ আমাদের সামনে এক বিশাল রহস্য খুলে দিয়েছে।”
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, পিএসআর জে২৩২২-২৬৫০বি ভবিষ্যতে গ্রহ গঠন ও মহাজাগতিক রসায়ন সম্পর্কে আমাদের ধারণাই বদলে দিতে পারে।
সূত্র: স্পেস