চাঁদের দিকে এক মহাকাব্যিক যাত্রার পর মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার আর্টেমিস-২ মিশনের চারজন নভোচারী আজ পৃথিবীতে অবতরণ করতে যাচ্ছেন। তাদের ফিরে আসা নিয়ে আগে থেকেই ব্যাপক শঙ্কা কাজ করছিল বিজ্ঞানীদের মনে। কারণ মহাশূন্যে ফিরতি যাত্রায় সবচেয়ে কঠিন ও বিপজ্জনক পর্যায় পার করতে হয়। মিশনের চার নভোচারী হলেন– কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার এবং মিশন বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা কোচ ও জেরেমি হ্যানসেন।
স্পেস ডটকম লিখেছে, পৃথিবীর দিকে যাত্রার সবচেয়ে ভয়ংকর অংশটি হলো ঘণ্টায় প্রায় ২৪ হাজার মাইল (৩৮ হাজার ৬০০ কিলোমিটার) বেগে বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে আসতে হয়, যা শব্দের চেয়ে ৩০ গুণ বেশি গতির যাত্রা। এই যাত্রার মধ্যে রয়েছে ১৩ মিনিটের এক ‘অগ্নিময় অবতরণ’। নভোচারীরা এ সময় প্রায় পাঁচ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট (দুই হাজার ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রার মুখে পড়বেন। নিজেদের সুরক্ষার জন্য থাকবে কেবল তাদের হিট শিল্ড এবং গতি কমানোর জন্য প্যারাসুট। নাসার সহযোগী প্রশাসক অমিত ক্ষত্রিয় বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত ৯ দিনে আমরা যে প্রতিটি মুহূর্ত দেখিয়েছি, তার সবই ফিরতি যাত্রার ওপর নির্ভর করছে। আমরা যে পদ্ধতি, হিট শিল্ড, প্যারাসুট এবং পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা তৈরি করেছি, তার ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।’ নাসা গতকাল শুক্রবার জানায়, ফিরতি যাত্রায় মহাকাশযান ওরিয়নে এর থ্রাস্টারগুলো চালু হয়েছে, যা আর্টেমিস-২-এর ক্রুদের পৃথিবীর দিকে ঠেলে দিয়েছে। ক্রুরা এখন পৃথিবীর দিকে যাত্রায় অর্ধেকেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়েছেন। গতকাল সকালে নাসার কর্মকর্তারা মিশনের অবস্থা নিয়ে ব্রিফিং করেন। তারা জানান, স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ৮টা ৭ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় আজ ভোর ৬টা ৭ মিনিট) সান ডিয়েগোর উপকূলে তারা অবতরণ করবেন। এর পর নভোচারীদের যখন একটি উদ্ধারকারী উড়োজাহাজে নিয়ে যাওয়া হবে, তখন একজন ডুবুরি মহাকাশযানের হিট শিল্ডটির ছবি তোলার জন্য সমুদ্রে ডুব দেবেন, যা মিশনের কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রথম কিছু প্রমাণ দেবে।
চন্দ্রাভিযানের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ
মহাকাশে যে কোনো যাত্রার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধাপগুলোর মধ্যে একটি হলো ফিরতি যাত্রা। আর্টেমিস-২-এর নভোচারী ভিক্টর গ্লোভার চাঁদযাত্রার আগে পৃথিবীতে ফেরার সময় কেমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে তা জানান। তিনি বলেন, ফিরতি যাত্রার সময় তাদের মহাকাশযানটি গর্জন করতে করতে পৃথিবীর দিকে নেমে আসবে এবং বায়ুমণ্ডলের ঘন স্তরে প্রবেশ করবে। এ সময় প্রচণ্ড গতির ফলে বায়ুর অণুগুলো প্রচণ্ডভাবে সংকুচিত হয়, যা ক্যাপসুলের বাইরের অংশকে ভয়ানক উত্তপ্ত করে। ভিক্টর বলেন, ‘আমি সত্যি কথাই বলব। যেদিন আমাদের এই মিশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেদিন থেকেই আমি আসলে পৃথিবীতে ঝুঁকিপূর্ণ ফিরতি যাত্রার কথাই চিন্তা করছি।’
হিট শিল্ড নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন বিজ্ঞানীরা
আর্টেমিস-১ যখন ২০২২ সালে চাঁদের চারপাশে ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসে, তখন ক্যাপসুলের উইন শিল্টে গর্তের মতো দাগ ও ফাটল দেখা দিয়েছিল। সেবারের যাত্রাটি ছিল মনুষ্যবিহীন। ফাটলের বিষয়টিই বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তোলে। এবারের হিট শিল্ড নভোচারীদের কোনো সমস্যায় ফেলতে পারে কিনা, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন তারা। হিট শিল্ড হলো মহাকাশযানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ, যা মহাকাশযান এবং এর নভোচারীদের পৃথিবীতে ফিরে আসার সময় চরম তাপমাত্রা থেকে রক্ষা করে। যদি হিট শিল্ডটি বিকল হয়ে যায়, তবে মিশন ও এর ক্রুরা ভস্ম হয়ে যাবে। আর্টেমিস-২-এর ওরিয়ন মহাকাশযানে ব্যবহৃত হিট শিল্ড আগেরটির হুবহু নকল করা হয়েছিল। এ জন্য আগের হিট শিল্ডের সমস্যাগুলো এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তদন্ত ও বিশ্লেষণ করা হয়। আর্টেমিস-২-এর নভোচারীরা এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর আস্থা প্রকাশ করেন।
চন্দ্রযাত্রার আদ্যোপান্ত
মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার আর্টেমিস-২ চন্দ্রাভিযান গত ১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়। চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণ করার লক্ষ্য নিয়ে চার নভোচারী ওরিয়ন নামের মহাকাশযানে চড়ে রওনা করেন। মহাকাশযান উৎক্ষেপণ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পাস করেছে আর্টেমিস-২। অভিযানে অংশ নেওয়া রকেট, মহাকাশযান ও নভোচারীদের সাফল্য যেন হার মানিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের কল্পনাকেও। ১০ দিনের অভিযানের প্রথম ছয় দিনে নভোচারীদের বহনকারী ওরিয়ন ক্যাপসুলকে প্রত্যাশা মতো কাজ করতে দেখা গেছে। সম্ভবত সবচেয়ে বড় অর্জনটি হলো আর্টেমিস-২ এর নভোচারীদের ব্যাপক সক্ষমতা প্রমাণ হয়েছে। আর তা মহাকাশ অভিযান নিয়ে আশাবাদ জাগিয়েছে। এবার নভোচারীরা চাঁদে অবতরণ না করলেও পৃথিবী থেকে চাঁদের পেছন দিকে এমন একটি দূরবর্তী জায়গায় গেছেন, যেখানে আগে কখনও কোনো মানুষ পৌঁছায়নি। কেনেডি স্পেস সেন্টারের উৎক্ষেপণ স্থলে নাসার এসএলএস উৎক্ষেপণ রকেটটি পৌঁছানোর কয়েক দিন পরই আর্টেমিস-২ অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি পেয়েছে নাসা। গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে দুবার এর উৎক্ষেপণ বাতিল হয়েছিল। এর আগে ২০২২ সালের নভেম্বরে আর্টেমিস-১ অভিযান পরিচালনা করেছিল নাসা। তবে ওই অভিযানে কোনো মানুষকে পাঠানো হয়নি, শুধু মহাকাশযান গিয়েছিল।