1. admin@shwapnoprotidin.com : admin : ddn newsbd
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ১২:১০ পূর্বাহ্ন

রূপপুর এনপিপিতে রুশ প্রকৌশলীর মৃত্যু: নিছক কাকতাল নাকি গুপ্তহত্যা?

প্রতিবেদকের নাম :
  • আপডেটের সময় : শনিবার, ২ মে, ২০২৬
  • ৬৯ সময় দর্শন
স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক

পাবনার ঈশ্বরদীর মাটিতে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্প — রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (এনপিপি-নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট) যখন তার উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে, ঠিক তখন সেখান থেকে এলো এক রুশ প্রকৌশলীর মৃত্যুর খবর। আজ সরকালে মারা গেছেন চুরকিন ভ্লাদিমির (৪০)  নামের একজন প্রতিভাবান প্রকৌশলী।

রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা রোসাটমের তত্ত্বাবধানে ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে প্রায় ৭ হাজার রাশিয়ান প্রকৌশলী ও কর্মী কাজ করছেন। কিন্তু বিদ্যুতের আলো জ্বালানোর এই স্বপ্নযাত্রায় একটি অন্ধকার ছায়া ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে।

গত আট বছরে এই প্রকল্পে অন্তত ২৫ জন বিদেশি প্রকৌশলীর মৃত্যু হয়েছে। শুধু ২০২৫ সালেই পাঁচটি মৃত্যু রেকর্ড হয়েছে। আর ২০২৬ সালের প্রথম ৫ মাসে যোগ হয়েছে আরও দুটি নাম।

প্রতিটি মৃত্যুর পর পুলিশ বলেছে “প্রাথমিকভাবে স্বাভাবিক মৃত্যু”। ময়নাতদন্ত হয়েছে, প্রতিবেদন এসেছে — কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকে গেছে।

এসব ঘটনাকে নিছক কাকতাল মানতে নারাজ সংশ্লিষ্ট অনেকেই, বরং গুপ্তহত্যার মত গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এরইমধ্যে।

মৃত্যুর তালিকা যখন দীর্ঘ হয়

২০২২ সালের একটি ঘটনা প্রথমবারের মতো সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ৫ রাশিয়ান প্রকৌশলীর মৃত্যু ঘটে। কেউ সিঁড়ি থেকে পড়ে, কেউ ঘুমের মধ্যে।

পুলিশ তদন্ত শুরু করে, ময়নাতদন্ত হয় — কিন্তু “সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি” এই বক্তব্য দিয়ে ফাইল বন্ধ হয়ে যায়। বিদেশি নাগরিক হওয়ায় কূটনৈতিক শর্ত ও বিধি মোতাবেক বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষেও বেশিদূর যাওয়া সম্ভব হয়নি।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মাত্র ৬ দিনের ব্যবধানে দুটি মৃত্যু ঘটে। ৪ঠা জানুয়ারি পাশাতারুক ক্সেনেলা (৪০) গ্রিন সিটির একটি বহুতল ভবন থেকে লাফিয়ে পড়েন।

পুলিশ “স্বামীর সাথে ঝগড়া”কে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে, কিন্তু প্রশ্ন থাকে — একটি নিরাপদ আবাসিক এলাকায়, পরিচিত সহকর্মীদের মাঝে, কোন মানসিক চাপ এতটা অসহনীয় হয়ে উঠল যে মৃত্যুই একমাত্র পথ মনে হলো তার কাছে?

১০ই জানুয়ারি ইভান কাইটমাজোভ (৪০) নিখোঁজ হন। ৫ দিন পর তাকে পাওয়া যায় নয় তলার ওয়াশরুমে, মৃত অবস্থায়। তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা জানান “আত্মহত্যার সন্দেহ রয়েছে, কারণ অজানা।” এই “অজানা কারণ” বাক্যটি বারবার ফিরে আসে এই প্রতিটি মৃত্যুর তদন্তে।

প্রকৌশলী রাইবাকভ মাকসিম

সেপ্টেম্বরে কারপোভ ক্রিল (২৬), একজন তরুণ ইলেকট্রিশিয়ান, ঢাকার জিগাতলার ভাড়া বাসায় উপুড় অবস্থায় তার মৃতদেহ উদ্ধার হয়। তার পরিবার ফোন ধরছিল না। নিরাপত্তা প্রহরীরা দরজা ভেঙে ঢোকেন। প্রাথমিক ধারণা — ব্রেন স্ট্রোক। বয়স মাত্র ২৬। সহকর্মীরা বলছেন, সে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন তিনি।

অক্টোবরে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়। মারা যান আনোয়ার আহমেদ (৫২) — একজন বাংলাদেশি নাগরিক, রাশিয়ান কোম্পানি নিকিমতের দোভাষী। রুশ ও বাংলাদেশি দুই পক্ষের মাঝে সেতুবন্ধন যিনি তৈরি করতেন, তাকেও ভাড়া বাসায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার মৃত্যু প্রমাণ করে — এই মৃত্যুর ধারা শুধু বিদেশি কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

২০২৬ সালের শুরুতেই রাইবাকভ মাকসিম (৩০) রূপপুর এনপিপির গ্রিন সিটির ভবনে মেঝেতে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় তার মরদেহ। তার রুমমেট কক্সবাজারে ছুটি কাটিয়ে ফিরে এই দৃশ্য দেখেন।

আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে — আজ ২রা মে, ২০২৬ — চুরকিন ভ্লাদিমির (৪০) ব্যায়াম করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই  ঘটে মৃত্যু।

প্যাটার্ন কি কাকতালীয়?

এই মৃত্যুগুলো পর্যালোচনা করলে কিছু সাদৃশ্য চোখে পড়ে।

প্রায় প্রতিটি মৃত্যুতেই মৃতব্যক্তি একা ছিলেন — বাসায়, ওয়াশরুমে, অথবা সহকর্মীরা অন্যত্র থাকার সময়। প্রতিটি ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে — এমন কারণ যা বাইরে থেকে প্রমাণ করা বা খণ্ডন করা কঠিন। বয়স সীমা তুলনামূলকভাবে তরুণ — ২৬ থেকে ৫২ বছর। এবং প্রতিটি মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রায়শই প্রকাশ্যে আসেনি।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার, মৃতরা সবাই নিউক্লিয়ার সায়েন্টিস্ট এবং সর্বোচ্চ দক্ষ প্রকৌশলী।

বারবার ঘটে যাওয়া এই ঘটনাগুলো কেবল “দুর্ভাগ্য” বলে উড়িয়ে দেওয়া কি সম্ভব? একটি প্রকল্পে ৮ বছরে অন্তত ২৫ জনের মৃত্যু — এটি কি পরিসংখ্যানগতভাবে স্বাভাবিক?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৭ হাজার কর্মীর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদে কিছু মৃত্যু স্বাভাবিক হতে পারে, কিন্তু একটি ক্লাস্টারের মতো একই সময়ে বারবার ঘটা মৃত্যু নজরদারি দাবি করে।

ব্যাখ্যা: তিনটি সম্ভাবনা

প্রথম সম্ভাবনা: মানসিক ও শারীরিক চাপ। বাংলাদেশে বিদেশি কর্মীদের জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন। ভাষার বাধা, পরিবার থেকে দূরত্ব, ভিন্ন সংস্কৃতি ও জলবায়ু — এসব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। পারমাণবিক প্রকল্পে কাজের চাপও অসাধারণ বেশি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মী বলেছেন, “এখানে কাজের চাপ অনেক। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কেউ কথা বলে না।” এই ব্যাখ্যা হয়তো সবচেয়ে সম্ভাব্য, কিন্তু এটি যদি সত্য হয় — তাহলে কর্তৃপক্ষ কেন এতদিন উদাসীন?

দ্বিতীয় সম্ভাবনা: ব্যবস্থাপনার গাফিলতি। একটি পারমাণবিক কেন্দ্রে প্রতিটি কর্মীর স্বাস্থ্য ও মানসিক অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার কথা। কারপোভ ক্রিলের ক্ষেত্রে জানা গেছে — তিনি দীর্ঘদিন অবসাদে ভুগছিলেন এবং ঢাকায় চিকিৎসাও নিয়েছিলেন। তার পরও তাকে একা ভাড়া বাসায় থাকতে দেওয়া হয়েছিল। ইভান কাইটমাজোভ পাঁচ দিন নিখোঁজ থেকেছিলেন — কেউ খোঁজ নেয়নি। এটি ব্যবস্থাপনার গুরুতর ব্যর্থতা।

তৃতীয় সম্ভাবনা: নাশকতা বা বাইরের হস্তক্ষেপ। একাধিক মহল মনে করে, রূপপুর প্রকল্পকে বিপর্যস্ত করতে আগ্রহী বিদেশি শক্তি এই মৃত্যুগুলোর পেছনে থাকতে পারে। রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা, বিশেষত পশ্চিমা মহল, বাংলাদেশে রোসাটমের সাফল্যকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থের বিরুদ্ধে দেখে। বিভিন্ন দেশে পারমাণবিক প্রকল্পে নাশকতার ইতিহাস রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনা এখনও সম্পূর্ণ অপ্রমাণিত এবং ময়নাতদন্তে কোনো বাইরের হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে ইউনূস সরকারের সময় ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে রহস্যময় অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় বিপুল অর্থব্যয়ে রাশিয়া থেকে আসা এনপিপির গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থা এর পেছনে ইউক্রেনের ষড়যন্ত্র দাবি করেছেন।

যা জানা দরকার, কিন্তু বলা হচ্ছে না

এই পুরো অনুসন্ধানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়টি হলো স্বচ্ছতার অভাব। রোসাটম কর্তৃপক্ষ এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসেনি। আট বছরে ২৫টি মৃত্যুর কোনো বিস্তারিত কারণ-ভিত্তিক পরিসংখ্যান সরকারিভাবে প্রকাশিত হয়নি।

একটি পারমাণবিক প্রকল্পে এই স্তরের গোপনীয়তা কতটুকু গ্রহণযোগ্য? যে প্রকল্পটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সাথে সরাসরি সংযুক্ত, সেখানে কর্মরত মানুষদের মৃত্যু নিয়ে জনগণের জানার অধিকার আছে।

বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন — প্রতিটি মৃত্যুর স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, রোসাটম ও বাংলাদেশ সরকার উভয়ের বাইরে থেকে। কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং একাকী বসবাসকারী কর্মীদের জন্য বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা এখনই নেওয়া দরকার।

সর্বশেষ ঘটনাটি

আজ ২রা মে চুরকিন ভ্লাদিমির ব্যায়াম করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন। হয়তো সত্যিই হৃদরোগ। হয়তো সত্যিই কাকতালীয়। কিন্তু যখন একই প্রকল্পে একই ধরনের মৃত্যু বারবার ঘটে, একই ধরনের অস্পষ্ট উত্তর দেওয়া হয়, একই ধরনের তদন্তে একই ধরনের কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না — তখন প্রশ্নটা আর উপেক্ষা করা যায় না।

রূপপুর বাংলাদেশের ভবিষ্যতের প্রতীক। কিন্তু সেই ভবিষ্যত গড়তে গিয়ে যারা তাদের জীবন হারাচ্ছেন, তাদের মৃত্যুর সত্য জানার অধিকার তাদের পরিবারের, এই দেশের মানুষের এবং ইতিহাসের।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
২০২5© এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ*
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Smart iT Host