অনলাইন ডেস্ক
ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সেলের সর্বশেষ মাসিক প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে রাষ্ট্রীয় বাহিনী, সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং সেটলার বাঙালিদের দ্বারা সংঘটিত একাধিক হত্যা, নির্যাতন, তল্লাশি ও সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
সেনাবাহিনীর তল্লাশি ও হয়রানি
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এপ্রিল মাস জুড়ে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, গুইমারা, লক্ষীছড়িসহ বিভিন্ন উপজেলায় সেনাবাহিনী নিরীহ পাহাড়িদের বাড়িতে হয়রানিমূলক তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করেছে। গভীর রাতে ও ভোররাতে নিরীহ গ্রামবাসীদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২ এপ্রিল বাঘাইছড়ির বঙ্গলতলী ইউনিয়নে দুটি পরিবারের বাড়িতে সেনাবাহিনী হয়রানিমূলক তল্লাশি চালায়। ৮ এপ্রিল গুইমারার কুকিছড়ায় ভোররাত আনুমানিক দুইটার সময় গ্রামবাসী কংহ্লা প্রু মারমার বাড়িতে গভীর রাতে অভিযান চালানো হয়।
তল্লাশিকালে সেনারা রান্নাঘর ও পানির পাত্র পর্যন্ত তল্লাশি করে প্লাস্টিকে মোড়ানো কিছু টুথব্রাশ ও জং ধরা লোহার টুকরো পেয়ে সেগুলোকে সন্দেহজনক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী মিথ্যাভাবে উক্ত বাড়িটিকে ইউপিডিএফ সদস্যের বাড়ি দাবি করে অস্ত্র উদ্ধারের নাটক সাজায় বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
১৯ এপ্রিল লক্ষীছড়ির হুদুকছড়িতে মধ্যরাতে তিনটি পরিবারের বাড়িতে সেনাবাহিনী একই ধরনের হয়রানিমূলক তল্লাশি চালায়। ২৭ এপ্রিল বাঘাইছড়িতে পুরনো বিদ্যালয়কক্ষে রাখা এলাকাবাসীর সামাজিক কাজে ব্যবহৃত তৈজসপত্র লুট করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
উৎসবের দিনেও সেনা অভিযান, আতঙ্কে পাহাড়িরা
পার্বত্য পাহাড়িদের প্রধান সামাজিক উৎসব বিজু চলাকালীন সময়েও সেনা অভিযান অব্যাহত ছিল। ১২ ও ১৩ এপ্রিল বিজু উৎসবের দিনগুলোতে খাগড়াছড়ি সদর ও কাউখালীর বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনীর সক্রিয় তৎপরতা উৎসবের আনন্দকে ম্লান করে দেয়।
স্থানীয় মুরুব্বি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বছরে একবার এই উৎসব পালন করা হয়, অথচ বিনা কারণে সেনাবাহিনীর তৎপরতায় জনমনে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
১৫ এপ্রিল মাতিরাঙার ভগবানটিলায় সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল ফেরদৌস হাসান সেলিমের সফর নিয়েও জনমনে নানা কৌতূহল ও সন্দেহ দেখা দেয়।
স্থানীয়রা জানান, জিওসির সফরকালেও জেএসএস (সন্তু)-র সশস্ত্র সদস্যরা এলাকার অন্তত সাতটি স্থানে অবস্থান করছিল, যা স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি করে।
সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে হত্যা
প্রতিবেদনে দুটি পৃথক হত্যার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রথম ঘটনায় ৮ এপ্রিল খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার আকবাড়ি এলাকায় সেনা-সৃষ্ট ঠ্যাঙাড়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ইউপিডিএফ সদস্য নিউটন চাকমা ওরফে নির্মল (৪৭)-কে গুলি করে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডে রাষ্ট্রীয় দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তাও সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন বলে পরবর্তী তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, মাহফুজুর রহমান মাসুম নামক একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী।
দ্বিতীয় ঘটনায় ১৭ এপ্রিল রাঙামাটির কুদুকছড়িতে জেএসএস (সন্তু)-র সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ধর্মশিং চাকমাকে গুলি করে হত্যা করে। হামলায় তার দুই বোন কৃপাসোনা চাকমা (৪৫) ও ভাগ্যশোভা চাকমা (৩৫) গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন।
ঘটনার প্রতিবাদে গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম তাৎক্ষণিকভাবে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে অবরোধ পালন করে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০১৮ সালেও একই গ্রামে সেনাবাহিনী-সৃষ্ট সন্ত্রাসীরা ধর্মশিং চাকমাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল।
প্রশাসনের বৈষম্যমূলক আচরণ
১ এপ্রিল খাগড়াছড়ির মাতিরাঙা উপজেলাধীন আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র এলাকায় জেলা প্রশাসনের একটি দল পাহাড়িদের অন্তত ১২টি দোকান বৈধ কাগজপত্র না থাকার অজুহাতে হঠাৎ বন্ধ করে দেয়।
ক্ষতিগ্রস্ত দোকানিরা অভিযোগ করেন, এই দোকানগুলোই তাদের পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস ছিল। স্থানীয়রা প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে ‘সাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যমূলক আচরণ’ বলে অভিহিত করেন। ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার পর পরদিন দোকানিদের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ডেকে বৈসু উৎসব পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।
বন বিভাগের নির্যাতন
১১ এপ্রিল বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার মাতামুহুরি রিজার্ভ এলাকায় বন বিভাগের কর্মকর্তারা জুমচাষি খিনওয়াই ম্রোর নতুন জুমে রোপণ করা প্রায় এক হাজারটি কলাগাছ কেটে ধ্বংস করে দেয়। এতে আনুমানিক ৪৯,৫০০ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার একজন সাধারণ মানুষের জন্য এই অর্থ এক বছরের জীবিকার সমান।
সেটলার বাঙালিদের সাম্প্রদায়িক হামলা
১৩ এপ্রিল চাকমা সম্প্রদায়ের ‘মূল বিজু’ উৎসবের দিন কাউখালীর ঘাগড়া বাজারে সিএনজি ভাড়া নিয়ে বিরোধের জেরে সেটলার বাঙালিদের হামলায় অন্তত ২০ জন পাহাড়ি যুবক আহত হন।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, হামলার সময় ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর তিনটি টহলরত গাড়ি উপস্থিত থাকলেও সেনা সদস্যরা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেননি। আহতরা রক্তাক্ত অবস্থায় সাহায্য চাইতে গেলে সেনা সদস্যদের একজন বলেন, “এটা আমাদের দায়িত্ব না।”
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা
প্রতিবেদনে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার দুটি ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
২৩ এপ্রিল বান্দরবানের থানচিতে একজন বাঙালি ফেরিওয়ালা ১২ বছর বয়সী একটি ম্রো শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। স্থানীয়রা অভিযুক্তকে আটক করলেও দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে মাত্র ১০ হাজার টাকা জরিমানায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ন্যায়বিচারের পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে ধর্ষণচেষ্টার আসামিকে মুক্তি দেওয়ার এই ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
২০ এপ্রিল বান্দরবান সদরে একজন বাঙালি রাবার বাগানের শ্রমিক কর্তৃক ১৭ বছর বয়সী একটি পাহাড়ি কিশোরীকে উত্ত্যক্ত করার ঘটনাও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ
১ এপ্রিল বান্দরবানের লামা উপজেলার বোচাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণির ছাত্রী রেশমি ত্রিপুরাকে সহকারী শিক্ষক ফরিদুল আলম বর্ণমালা লিখতে না পারায় স্কুলের সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে মুখ চেপে ধরে মারাত্মক নির্যাতন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্যাতনের একপর্যায়ে শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। পরে শিশুটির মা বিদ্যালয়ে এসে আর্তনাদ ও অভিযোগের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে এলাকাজুড়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
ইউপিডিএফের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সেল প্রতিবেদনে এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দাদের হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক অভিযান ও হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
নাগরিক সমাজ ও সচেতন মহল মনে করছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও পার্বত্য পরিস্থিতির কোনো উন্নতি না হওয়া গভীর উদ্বেগের বিষয় বলে তারা মন্তব্য করেছেন।







