“হায় আল্লাহ, আমার খালি মনে হয় আমি যদি একবার কোনো মন্ত্রণালয় বা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেতাম, মানুষের জন্য জীবন দিয়ে কাজ করতাম,হৃদয় দিয়ে মানুষকে ভালোবাসতাম। মানুষের হৃদয় জয় করা মানে আল্লাহর হৃদয় জয় করা…” অধ্যাপক আসিফ নজরুল এমন মন্তব্য করেছিলেন একসময়। সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীনের অনুষ্ঠানে তার সেই বক্তব্য রীতিমত ভাইরাল হয়ে যায়। রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচ না বোঝা অতি সাধারণ মানুষ ভেবেছিলেন, এমন লোককে যদি কখনো সুযোগ দেওয়া হয়, দেশটাকে সোনার দেশ বানিয়ে ফেলবেন! ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়ে সেই আকাঙ্ক্ষার কতটা বাস্তবায়ন ঘটাতে পেরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক? সাধারণ মানুষ্ এবং আল্লাহর হৃদয় জয় করতে পেরেছিলেন, নাকি নিজের আখের গুছিয়ে লুটপাটের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছেন?
গত ৪ঠা মার্চ সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত বলে দাবি করেন। ‘আসিফ নজরুলের দুর্নীতি?’ শিরোনামে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন সরকারে থাকা অবস্থায় বা এর আগে-পরে জীবনে কখনো কোনো দুর্নীতি করেননি। ওই ফেসবুক পোস্টে আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমি সরকারে থাকা অবস্থায় বা এর আগে-পরে জীবনে কখনো কোনো দুর্নীতি করিনি। এক টাকা-আবার বলি, এক টাকাও দুর্নীতি করিনি। আমার জ্ঞাতসারে কাউকে দুর্নীতি করতেও দিইনি। আমি কোনো নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলিনি, আমার কোনো নতুন সম্পদ হয়নি, আয়কর দেওয়ার সময় আমি কোনো সম্পদ অপ্রদর্শিত রাখিনি। আমি কোনো দুর্নীতি করিনি, করার প্রশ্নই আসে না।’
আসিফ নজরুলের দুর্নীতি নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকা একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে:
নিজেকে নির্দোষ দাবি করে দেওয়া আসিফ নজরুলের এই মন্তব্য জাতির সঙ্গে আরেকটি প্রতারণা। দেড় বছর একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বদলি বাণিজ্য, জামিন বাণিজ্য, জেলা প্রশাসক নিয়োগ, নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রদান করে সততার দাবিদার এই সাবেক উপদেষ্টা বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। আর এসব সম্পদ প্রায় সবই বেনামে।
গত দেড় বছরে তার দূর সম্পর্কের আত্মীয়স্বজনের সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে কয়েকগুণ। এমনকি তার সাবেক স্ত্রীর দুই কন্যাও এখন বিপুল সম্পদের মালিক। যাদের একজন আসিফ নজরুলের ঔরসজাত। ওই সন্তানের নামে নিউ ইস্কাটনে একটি বাড়ি কেনা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে ১৬/১৭ বছরের একজন ছাত্রী ইস্কাটনের মতো অভিজাত এলাকায় বাড়ি কেনার অর্থ পেল কোথায়? আসিফ নজরুল কৌশলে দূর সম্পর্কের আত্মীয়স্বজনের কাছে দুর্নীতির অর্থ রেখে নিজেকে সাধু প্রমাণের চেষ্টা করেছেন।
আসুন দেখে নেওয়া যাক, আসিফ নজরুলের দুর্নীতির কিছু ঘটনা।
সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে ঘুষ বাণিজ্যের রেকর্ড
আসিফ নজরুলের দেড় বছরের রাজত্বে সবচেয়ে আলোচিত দুর্নীতির একটি ছিল সাব-রেজিস্ট্রার বদলি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ১৮ মাসে আইন মন্ত্রণালয়ে শুধু সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতেই ঘুষ লেনদেন হয়েছে শতকোটি টাকা।
তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের আমলে সাব-রেজিস্ট্রার বদলির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নীতিমালা মানা হয়নি। ঘুষের বিনিময়ে বদলির ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত টাকা পরিশোধ না করায় বদলির আদেশ স্থগিত করার প্রমাণও পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাউকে কাউকে ছয়-সাত মাসের মধ্যে তিন-চারবার বদলি করা হয়েছে। আঠারো মাসে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে কমপক্ষে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২০০ জন ঘুষের মাধ্যমে পছন্দের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি বাগিয়ে নিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ভালো জায়গায় বদলির জন্য ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়েছেন আসিফ নজরুল। সাধারণ বদলির জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। অতীতে কখনো মাত্র ৮ মাসে এত বিপুলসংখ্যক বদলির ঘটনা ঘটেনি।
আর সব দুর্নীতি ও অপকর্ম করার জন্য একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছিল। ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা ছিল তার একসময়ের পিএস সামসুদ্দিন মাসুম, মো. মোয়াজ্জেম হোছাইন, আবদুল আলম মাসুম, মোর্শেদ আল মামুন ভূইয়া, নূরে আলম, আজিজুল হক, মোস্তাফিজুর রহমান, মো. রবিউল ইসলাম।
মাসুম তার ক্যাশিয়ার হিসেবে টাকা-পয়সার দেখভাল করত বলে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের কাছে ছিল ওপেন সিক্রেট। কেউ কেউ বলত মাসুমের সিদ্ধান্ত ছাড়া আইন মন্ত্রণালয়ের দরজাও খোলে না। একপর্যায়ে মাসুম উপদেষ্টার মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করার কারণে তাকে বদলি করা হয়।
বদলির বিধান অনুযায়ী, ‘এ’ গ্রেডের সাব-রেজিস্ট্রারকে ‘এ’ গ্রেডের অফিসে এবং ‘সি’ গ্রেডের কর্মকর্তাকে ‘সি’ গ্রেডের অফিসে বদলি করতে হয়। তবে ওই সময়কালে ঘুষের বিনিময়ে ‘সি’ ও ‘বি’ গ্রেডের সাব-রেজিস্ট্রারদের অনেককেই পোস্টিং দেওয়া হয়েছে উচ্চতর গ্রেডের কার্যালয়ে। এ ক্ষেত্রে ঘুষ দিতে রাজি না হওয়ায় ‘এ’ গ্রেডের সাব-রেজিস্ট্রারদের ‘শাস্তিমূলকভাবে’ ‘বি’ বা ‘সি’ গ্রেডের অফিসে বদলি করা হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, তাদের অনেককেই বারবার বদলির মুখে পড়তে হয়েছে। কাউকে কাউকে যোগদানের আগের দিন পুনরায় অন্য অফিসে বদলির নির্দেশ দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বদলি বাণিজ্যের মাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে, গত বছরের ১লা জুন খোদ আইন মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে সতর্কতা জারি করে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জেলার রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার বদলি ও পদায়নে কোনো আর্থিক লেনদেনের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে কোনো অসাধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক কোনো ধরনের প্রলোভন, প্রস্তাব বা প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ করা হলো।
কিন্তু এ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই শত শত সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে বিপুল অঙ্কের ঘুষের লেনদেন হয়েছে। এ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আর কোনো বদলির আদেশ হয়নি।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিবন্ধন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে যুগ যুগ ধরে ‘ঘুষ বাণিজ্য’ হয়ে আসছে। তবে সেসব ক্ষেত্রে অন্তত সরকারি ও রাষ্ট্রীয় নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের ওই আট মাসে ‘ঘুষ বাণিজ্যে’ কোনো ধরনের নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। দুদক বা আইন প্রয়োগকারী যেকোনো কর্তৃপক্ষ শুধু নীতিমালা ভঙ্গের বিষয়টি অনুসন্ধান করলেই ‘ঘুষ বাণিজ্যের’ প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পাবে।’
দায়িত্ব গ্রহণের পর একাধিক জেলা রেজিস্ট্রারের পদোন্নতি ও বদলির আদেশ দেন আসিফ নজরুল। তবে সাব-রেজিস্ট্রারদের প্রথম বদলির আদেশ দেন সে বছরের ২৯শে সেপ্টেম্বর। আদেশে মোট ১৭ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়। এ ক্ষেত্রে ‘সি’ গ্রেডের কয়েকজন সাব-রেজিস্ট্রারকে ‘এ’ গ্রেডের অফিসে বদলি করে অধিদপ্তরের নীতিমালা ভঙ্গ করা হয়।
এ আদেশে (২৯শে সেপ্টেম্বর) সাব-রেজিস্ট্রার মনীষা রায়কে নীলফামারীর জলঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি করা হয়। এর চার মাস পর ২০২৫ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারি মনীষাকে হরিপুর থেকে বদলি করা হয় দিনাজপুরের হাকিমপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে হাকিমপুরে যোগদানের আগের দিন মনীষাকে আবার বদলি করা হয় ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে।
একইভাবে ২০২৫ সালের ৯ই এপ্রিল সাব-রেজিস্ট্রার রেহানা পারভীনকে বরিশালের রহমতপুর থেকে ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ায় বদলি করা হয়। তবে ‘তদবিরের মাধ্যমে’ মাত্র দুই দিনের মধ্যে রেহানা ১১ই এপ্রিল বদলি নিয়ে বরিশালের মুলাদী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগদান করেন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে সাব-রেজিস্ট্রার সঞ্জয় কুমার আচার্যকে চট্টগ্রাম সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বদলি করা হয় কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে। তিনিও দুই দিন পরই বদলি নিয়ে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় চলে আসেন। ২০২৪ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর সাব-রেজিস্ট্রার শাহ আবদুল আরিফকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বদলি করা হয়। যোগদানের আগের দিন ৬ই অক্টোবর এই বদলি স্থগিত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
আইন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ২০২৪ সালের আগস্টে আইন উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার বদলিসংক্রান্ত অন্তত ১৬টি আদেশ জারি হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর থেকে ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচটি আদেশে ৮৭ জনকে বদলি করা হয়।
২০২৫ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ২৭শে এপ্রিল পর্যন্ত ১১টি আদেশে ১৯৫ জনকে বদলি করা হয়। আদেশগুলো হলো-২০২৪ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর ১০ জন, ২৯শে সেপ্টেম্বর ১৭ জন, একই বছরের ৭ই অক্টোবর ৫ জন, ১লা ডিসেম্বর ৩৮ জন, ১৯শে ডিসেম্বর ১৭ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়।
২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক সাব-রেজিস্ট্রার বদলি করা হয়। এর মধ্যে ১৩ই জানুয়ারি ৫ জন, ১৫ই জানুয়ারি ১২, ৩রা ফেব্রুয়ারি ১৭, ৫ই ফেব্রুয়ারি ১০, ৯ই ফেব্রুয়ারি ২, ১৯শে ফেব্রুয়ারি ৩৬, ২৪শে ফেব্রুয়ারি ২, ১৭ই মার্চ ২৬, ৯ই এপ্রিল ৩৬, ১০ই এপ্রিল ৪ এবং ২৭শে এপ্রিলে ৪৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করা হয়।
এর মধ্যে অন্তত ২০০ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের পছন্দের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিচারক বদলিতে নজিরবিহীন দুর্নীতি
গত বছরের জুনে বাংলাদেশের নিম্ন আদালতে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। ২রা জুন সারা দেশের বিভিন্ন আদালতের ২৫২ জন বিচারককে একযোগে বদলি করা হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে এ বিষয়ে পৃথক পাঁচটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হলে সারা দেশে হইচই পড়ে যায়। কারণ সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ ছাড়া এভাবে ঢালাও বদলি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, দেশের বিভিন্ন জেলার ৩০ জন জেলা ও দায়রা জজ এবং সম পদমর্যাদার বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ও সম পদমর্যাদার ৩৮ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ও সম পদমর্যাদার ২২ জন বিচারক এবং সিনিয়র সহকারী জজ ও সহকারী জজ এবং সম পদমর্যাদার ১৬২ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে জেলা ও দায়রা জজ/মহানগর দায়রা জজ/চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট/পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা/দপ্তর প্রধান কর্তৃক মনোনীত কর্মকর্তার কাছে আগামী ৩রা জুন বর্তমান পদের দায়িত্বভার অর্পণ করে অবিলম্বে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদানের জন্য অনুরোধ করা হয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ঢালাও বদলির পেছনে রয়েছে দুর্নীতির শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যার নেতৃত্বে ছিলেন আসিফ নজরুল। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর, বিচারক বদলি বাণিজ্যের পরিকল্পনা হাতে নেন। তার ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন চূড়ান্ত করার পর একযোগে বদলি করা হয়। এই বদলি বাণিজ্য করে আসিফ নজরুল হাতিয়ে নেন কয়েক শ কোটি টাকা।
জামিন বাণিজ্য
আসিফ নজরুল টাকার বিনিময়ে বহু আসামির জামিন করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব জামিনের বিনিময়ে তিনি কয়েক শ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে জানা গেছে। এসময় আলোচিত জামিনের মধ্যে ছিল, শেয়ারে জালিয়াতি ও ভাই হত্যার মামলায় ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন হোসেনের জামিন। একদিনে তিনটি মামলায় তাকে জামিন দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এমনকি যে আদালত তাকে জামিন দিয়েছে, তার জামিন দেওয়ার এখতিয়ারও সেই আদালতের ছিল না।
গান বাংলার তাপসের জামিন হয়েছিল টাকার বিনিময়ে। শুধু জামিন নয়, আসিফ নজরুলের হস্তক্ষেপে তাপসকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এরকম অন্তত দুই ডজন ব্যক্তিকে আসিফ নজরুল অর্থের বিনিময়ে জামিন দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এদের মধ্যে রয়েছেন ব্যবসায়ী, সাবেক আমলা এবং আওয়ামী লীগ নেতা।
জেলা প্রশাসক পদায়নে অর্থের লেনদেন
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আসিফ নজরুল হয়ে উঠেছিলেন দ্বিতীয় ক্ষমতাবান ব্যক্তি। প্রধান উপদেষ্টার পরপরই তার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ছিল। এমনকি প্রধান উপদেষ্টা তার পরামর্শ অনুযায়ী অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর কয়েকজন আমলাকে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে সাবেক জনপ্রশাসন সচিব মোখলেসুর রহমান ছিলেন অন্যতম।
মোখলেস দায়িত্ব নেওয়ার পর সারা দেশে জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া শুরু করেন। এ সময় ডিসি নিয়োগে ব্যাপক ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। অনিয়ম খতিয়ে দেখার জন্য গঠিত হয় একটি তদন্ত কমিটি। এই কমিটিতে আসিফ নজরুল ছিলেন একক ক্ষমতার অধিকারী। মোখলেসের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে আসিফ নজরুল তাকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্ত করেন। বিনিময়ে ডিসি পদায়নে নিজের পছন্দের নাম দিতে শুরু করেন।
কিন্তু বিপত্তি ঘটে, যখন চট্টগ্রামের ডিসি পদায়নে আসিফ নজরুলের পছন্দের প্রার্থীর বিপরীতে ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও নাম দেন। দুজনই বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নাম দিয়েছিলেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর মোখলেসুর রহমানকে জনপ্রশাসন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এ নিয়ে সেসময়ে অনেক আলোচনার জন্ম হয়েছিল।
শুধু জেলা প্রশাসক নয়, আসিফ নজরুল অনেক সচিবকে পদায়নের বিনিময়ে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্য করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪-এর ৫ই আগস্টের পর আইন সচিব হিসেবে গোলাম সারোয়ারকে রাখা হয়েছিল আসিফ নজরুলের ইচ্ছায়। গোলাম সারোয়ার ছিলেন সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের খুবই বিশ্বস্ত। আওয়ামী লীগ আমলে খালেদা জিয়া ও বিএনপির বিরুদ্ধে যতগুলো মামলা হয়েছে সব ড্রাফটই ছিল সারোয়ারের।
১০ কোটি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সচিব হিসেবে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সারোয়ার সময়মতো টাকা দিতে অস্বীকার করায় সরিয়ে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রদানে দুর্নীতি
আইন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি আসিফ নজরুল প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাও ছিলেন। এখানেও তার বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগ। আসিফ নজরুল এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দেওয়া শুরু করেন। এর মাধ্যমে তিনি শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতে ২০২৫ সালে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ১৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। একই বছর বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩১ বিলিয়ন ডলার। দেড়শ কোটির জনসংখ্যার দেশ ভারতে জনশক্তি রপ্তানি খাতে রিক্রুটিং এজেন্সি আছে মাত্র ১ হাজার ৯৮৮টি। অন্যদিকে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ১৮ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ২ হাজার ৬৪৬।
শুধু ভারত নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রিক্রুটিং এজেন্সি সক্রিয় আছে বাংলাদেশে। এমনকি পৃথিবীর বড় বড় শ্রম রপ্তানিকারক দেশগুলোর তুলনায়ও এ সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় নতুন আরও ২৫২টি প্রতিষ্ঠানের রিক্রুটিং লাইসেন্স অনুমোদন দেয় মূলত আসিফ নজরুলের ইচ্ছায়। মন্ত্রণালয় থেকে গত বছরের ৪ঠা নভেম্বর উপসচিব আশ্রাফ আহমেদ রাসেলের স্বাক্ষরে অনুমোদন পাওয়া এসব প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিবিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি তাদের প্রতিবেদনে (ডিসেম্বর, ২০২৪) রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা যৌক্তিক মাত্রায় কমিয়ে আনার সুপারিশ করেছিল। তবে এর মধ্যে নতুন ২৫২টি রিক্রুটিং লাইসেন্স অনুমোদন দেওয়া হয়।
জানা গেছে, এসব লাইসেন্স প্রদানে সাবেক উপদেষ্টা ১ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন। একই দিনে (স্মারক নম্বর ৪৯.০০.০০০০.০৫৭.২৭.৯৪১.২৫-২৭৪) আরও ২৬০টি আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, যারা নির্দিষ্ট চ্যানেল ধরে টাকা দিতে পারেনি তাদের আবেদনই নামঞ্জুর করা হয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা কমানোর লক্ষ্যের সঙ্গে এ নতুন লাইসেন্স দেওয়া সংগতিপূর্ণ নয়। তাদের মতে, অভিবাসী কর্মীদের মানব পাচারের শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং এ খাতে জবাবদিহি, সুশাসন ও তদারকি নিশ্চিত করতে হলে এজেন্সির সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে।
দেশে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ শ্রমিক প্রেরণ, বন্ধ শ্রমবাজার চালু করা এবং নতুন শ্রমবাজারের সন্ধান ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বড় প্রত্যাশা। পাশাপাশি প্রবাসীদের অধিকার রক্ষাসহ নানা ধরনের হয়রানি, জালিয়াতি ও দালালদের দৌরাত্ম্য রোধ করে এ খাতে সুশাসন ফেরার আশা করেছিলেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতিবিষয়ক শ্বেতপত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় সব রিক্রুটিং এজেন্সির অফিস রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় তারা কর্মী সংগ্রহে মাঠপর্যায়ে দালাল বা সাব-এজেন্টদের ওপর নির্ভর করে। এ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাবকে কাজে লাগিয়ে কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি এবং সাব-এজেন্ট প্রতারণা করে এবং একে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে জবাবদিহিতা এড়িয়ে যায়।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশি অভিবাসীরা বিদেশ যেতে সবচেয়ে বেশি অর্থ দেন। শ্বেতপত্রের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে যেসব কর্মী বিদেশ যেতে বিভিন্ন এজেন্সি বা দালালকে আংশিক খরচ পরিশোধ করেছিলেন, তাদের মধ্যে ১৯ শতাংশ বিদেশে যেতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ সময়ে বিদেশে যেতে না পারা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২৫৯ কোটি ডলার।
প্রায় প্রতি বছরই রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে হাজারো অভিযোগ জমা পড়ে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৪ সালে বিভিন্ন এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ে ২ হাজার ২১৩টি, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৩৮০টি, ২০২২ সালে ১ হাজার ২৪০টি, ২০২১ সালে ৫৮২টি এবং ২০২০ সালে ৯০৫টি।
আসিফ নজরুল অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। এর পেছনে রয়েছে অবৈধ আর্থিক লেনদেন।
আর এভাবেই সততার মুখোশ পরে আসিফ নজরুল গত দেড় বছরে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন






