অনলাইন ডেস্ক
চলমান জ্বালানি সংকটের ধাক্কা পরিবহণ সেক্টরে পড়েছে। তাই বেপারিরা রাজধানীসহ দেশের বড় মোকামগুলোতে পেঁয়াজ পাঠাতে পারছেন না। এর ফলে রাজশাহীসহ উত্তরের বিভিন্ন মোকামে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক দরপতন ঘটেছে। শুক্রবার রাজশাহীর কয়েকটি হাটবাজার ও মোকামে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকা মন দরে। সেই হিসাবে চাষিরা প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম পেয়েছেন মাত্র পৌনে ৪ থেকে ৫ টাকা করে। চাষিরা বলছেন দুই সপ্তাহ আগেও তারা প্রতি মন পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকা মন দরে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা বিক্রি হলেও উত্তরের হাটবাজার ও মোকামে চাষিরা পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন মাত্র পৌনে ৪ থেকে ৫ টাকা কেজি দরে।
রাজশাহীর বাগমারার চাষি আফসার আলী জানান, গত ১৫ বছরেও এত অস্বাভাবিক কম দামে পেঁয়াজ বিক্রির কোনো রেকর্ড নেই। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে তার এলাকার হাজার হাজার পেঁয়াজ চাষি পুঁজি হারিয়ে পথে বসছেন।
আরও কয়েকজন চাষিরা জানান, বাড়ি থেকে হাটে ও মোকামে পেঁয়াজ নিতে পরিবহণ খরচ হয় প্রতি মনে ৩০ টাকা। হাটে খাজনা দিতে হয় মনপ্রতি ৩০ টাকা। ফলে এক মন পেঁয়াজ বিক্রি করে চাষির পকেটে উঠছে মাত্র ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। অথচ এক প্রতি মন মুড়িকাটা পেঁয়াজ ফলাতে চাষির খরচ হয়েছে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা। প্রতি বিঘায় মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষের খরচ ৪৫ হাজার টাকা। চাষিরা এ বছর এক বিঘায় পেঁয়াজের ফলন পাচ্ছেন ৫৫ থেকে ৬০ মন করে। অথচ মোকামে বিক্রি করছেন মাত্র ৪ থেকে ৫ টাকা কেজি দরে। চাষিদের জন্য এটা এক অসহনীয় অবস্থা।
জানা যায়, রাজশাহীসহ উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলের পেঁয়াজপ্রধান সাতটি জেলার হাটবাজার ও মোকামে নিত্যপ্রেেয়াজনীয় এই কৃষিপণ্যটির অস্বাভাবিক দরপতন ঘটেছে। বর্তমানে চাষিরা জমি থেকে পুরোদমে পেঁয়াজ তোলার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কায় চাষিরা অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ ও শ্রমিকের মজুরি বাড়িয়ে দ্রুত পেঁয়াজ ওঠাচ্ছেন জমি থেকে। নগদ টাকার প্রয়োজনে উত্তরাঞ্চলের চাষিরা জমি থেকেই পেঁয়াজ কেটে-ছেঁটে নিকটবর্তী হাটবাজারে ও মোকামে তুলছেন। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে অস্বাভাবিক কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। শুক্রবার রাজশাহীর বাগমারা, পুঠিয়া ও দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে মানভেদে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা মন দরে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা। অনেকেই কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি না করে বাড়ির আঙিনায় পালা দিয়ে রাখছেন।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় ২১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে মুড়িকাটা বা আগামজাতের পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে ৮ হাজার ৩৪৪ হেক্টর জমিতে। এ মৌসুমে রাজশাহীতে পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৪ লাখ ৩২ হাজার ৩০০ টন। অন্যদিকে মুড়িকাটা পেঁয়াজ ফলনের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ টন। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় চলতি মৌসুমে রাজশাহীর সর্বত্রই তাহেরপুরী ও নাসিক এন-৫৩ জাতের পেঁয়াজের ভালো ফলন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা আরও জানান, বর্তমানে মুড়িকাটা পেঁয়াজ ওঠানো চলছে পুরোদমে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মুড়িকাটা পেঁয়াজ উত্তোলন শেষ হবে। এরপরই উঠতে শুরু করবে ছাঁচি বা দেশিজাতের পেঁয়াজ। জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে রাজশাহীর তাহেরপুর, আলোকনগর, হাটগাঙ্গোপাড়া, দামনাশ, দুর্গাপুরের আলীপুর, পুঠিয়ার ঝলমলিয়া, মোহনপুরের কেশরহাট, পবার খড়খড়ি ও নওহাটাসহ বিভিন্ন মোকামে অস্বাভাবিক কম দরে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। দাম না পাওয়ায় চাষিরা হাটের ফাঁকা মাঠে পেঁয়াজ রেখে চলে যাচ্ছেন। কারণ, পেঁয়াজ কেনার ক্রেতা পাচ্ছেন না।
রাজশাহীর বাগমারার সোনাডাঙ্গা গ্রামের পেঁয়াজ চাষি সুজন কুমার জানান, তিনি এবার ৬ বিঘা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ করেছিলেন। প্রতি বিঘায় ফলন পেয়েছেন গড়ে ৫৫ মন করে। প্রতি বিঘাতে খরচ হয়েছে ৪৫ হাজার টাকা করে মোট ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। পেঁয়াজ তুলে বাড়িতে পালা করে রেখেছেন। শুক্রবার হাটগাঙ্গোপাড়া মোকামে ৫৫ মন পেঁয়াজ তুলেছিলেন বিক্রির জন্য। এই পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন মাত্র ৭ হাজার ৭০০ টাকায়। এর মধ্যে পরিবহণ ও হাটের খাজনা বাবদ ৩ হাজার ৩০০ টাকা পরিশোধ করেছেন। সব খরচ মিটিয়ে ৪ হাজার ৪০০ টাকা পকেটে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘মোকামে চালানি ব্যাপারি আসছে না। পেঁয়াজ তুলে বেশিদিন ঘরেও রাখা যাচ্ছে না। এখন যে দাম পাচ্ছি তাতেই বিক্রি করছি। তার মতো শত শত চাষি মুড়িকাটা আবাদ করে বিপুল লোকসানের শিকার হয়েছেন। চাষিদের এই অসহনীয় দুরবস্থা দেখার কেউ নেই।’
পেঁয়াজ বেচা-বিক্রির দেশের অন্যতম বড় মোকাম রাজশাহীর তাহেরপুরের চালানি ব্যাপারি মোকসেদ আলী প্রামাণিক বলেন, ‘শত শত মন পেঁয়াজ উঠছে হাটে। কিন্তু বাইরের ব্যাপারি আসছে না পেঁয়াজ কিনতে। জ্বালানি সংকটের কারণে ট্রাক ভাড়া মিলছে না। আজ (শুক্রবার) মানভেদে প্রতি মন ১৫৫ টাকা থেকে ১৮০ টাকা মন দরে ২৩০ মন পেঁয়াজ কিনেছি। এই পেঁয়াজ আগামী দুদিনের মধ্যে ঢাকায় চালান করতে হবে। কিন্তু পরিবহণ পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া আরও ৩০০ মন পেঁয়াজ কেনার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না বলে আর কিনিনি।’ মোকসেদ আলীর মতো আরও অনেক চালানি ব্যাপারি পেঁয়াজ কিনছেন না গাড়ি না পাওয়ার কারণে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য মতে, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর ও রাজবাড়ী জেলায় দেশের অর্ধেক পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। এই সাতটি জেলায় ১ লাখ ৯২ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। এসব জেলায় চলতি মৌসুমে ১৯ লাখ ৮৮ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে পাবনায় সর্বাধিক ৪৫ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। এর পরেই ফরিদপুর ও রাজশাহী জেলায় বেশি হয় পেঁয়াজ।
সূত্র জানায়, দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদার পরিমাণ ৩৬ থেকে ৩৭ লাখ টন। বিপরীতে দেশের বিভিন্ন জেলায় পেঁয়াজ উৎপাদিত হয় ৩২ লাখ টন। চাহিদার বাকি পেঁয়াজ ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। পেঁয়াজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় ভরা মৌসুমে মূল্য বিপর্যয়ে প্রতিবছরই হাজার হাজার চাষি বিপুল আর্থিক লোকসানের শিকার হচ্ছেন।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান জানান, পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য। ভরা মৌসুমে সহজলভ্য হওয়ায় মোকামে আমদানি বাড়ে। এতে পেঁয়াজের দাম পড়ে যায়। চাষিরা উৎপাদনসহ আনুসঙ্গিক খরচ মেটাতে বাধ্য হয়ে জমি থেকে তুলেই পেঁয়াজ বিক্রি করতে হাটে তোলেন। এই সুযোগটা কাজে লাগায় ফড়িয়া, দালাল ও মজুতদাররা। কম দামে চাষির কাছ থেকে কিনে পেঁয়াজ গুদামে রাখেন। সরবরাহ কমে গেলে বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তারা মুনাফা করেন। পেঁয়াজ সংরক্ষণের সুবিধা কম থাকায় চাষিরা পানির দরে বিক্রি করছেন। জ্বালানি সংকটের প্রভাবও পেঁয়াজের দামের ওপর পড়েছে। জানা যায়, দেশে পেঁয়াজ সংরক্ষণের উদ্যোগ থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় বেশ কম। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য মতে, দেশের পেঁয়াজপ্রধান সাতটি জেলায় ২৮৫টি মডেল সংরক্ষণাগার আছে। এগুলোর ধারণক্ষমতা ১০ হাজার টন। স্টোরেজের প্রতিটিতে ২৫০ থেকে ৩০০ মন করে পেঁয়াজ রাখা যায়। কিন্তু বর্তমানে চাষিরা সরকারি সংরক্ষণাগারে পেঁয়াজ রাখার সুযোগ পাচ্ছেন না বিভিন্ন কারণে। পেঁয়াজের অস্বাভাবিক দরপতনের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আফিয়া আকতার জানান, রাজশাহী থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পেঁয়াজ আলু মাছসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বিপুল পরিমাণে চালান হয়ে থাকে। বর্তমানে জ্বালানির কিছুটা সমস্যা থাকায় কৃষিপণ্যের চালান ব্যাহত হচ্ছে। চালানে নিয়োজিত পরিবহণগুলো যাতে জ্বালানি পায় সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।