বেলা তখন ঠিক ১২.৩৫ মিনিট। কলেজে সুনসান নীরবতা। শ্রেণিকক্ষ বা মাঠে নেই শিক্ষার্থীদের কোলাহল। নেই কোনো শিক্ষক, পিয়ন, আয়া। শুধু অফিস সহকারী নিজ কক্ষে বসে খাতাপত্রের কাজ করছেন; তাঁর পাশে বসা একজন প্রভাষক। অধ্যক্ষের কক্ষে তালা ঝুলছে। সাংবাদিকের আগমনের খবর পেয়ে কয়েক শিক্ষক অর্ধেক রাস্তা থেকে ফিরে আসেন। কুড়িগ্রাম উপজেলার কৃষ্ণমঙ্গল স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়ে দেখা গেল এমন চিত্র। এ ঘটনার পর আরও দুই দিন ওই প্রতিষ্ঠানে গেলে প্রায় একই চিত্রের দেখা মেলে। অভিভাবকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর কলেজে আসেন না অধ্যক্ষ মো. মাহমুদ হাসান। তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগে শিক্ষকরা এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে চলে যান। কোনো ক্লাস হয় না। এমন অবস্থার কারণে বাধ্য হয়ে অভিভাবকরা তাদের ছেলেমেয়েকে অন্য কলেজে ভর্তি করেছেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় শিক্ষার্থীশূন্য।
প্রতিষ্ঠানটির কলেজ ও স্কুল শাখা মিলিয়ে শিক্ষক-কর্মচারী আছেন ৪৫ জন। প্রতিষ্ঠানটির কলেজ শাখায় প্রথম বর্ষে ১১ জন ও দ্বিতীয় বর্ষে ৩০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমিক শাখায় ৪১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
প্রভাষক নজরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন আসে না। তাই ক্লাসও হয় না। শিক্ষকরা কলেজে আসেন। কিন্তু শিক্ষার্থী না থাকায় ক্লাস হয় না।
শিক্ষার্থী রিনা আক্তার বলেন, কলেজে গিয়ে কী লাভ! কোনো ক্লাস হয় না। তাই কলেজে যাওয়াই বাদ দিয়েছি। বান্ধবীদের কারও বিয়ে হয়ে গেছে, কেউ অন্য কলেজে ভর্তি হয়েছে। অপর শিক্ষার্থী মাহজাবীন আক্তার বলেন, ‘আমার বাবা গরিব মানুষ; বাইরের কলেজে পড়াতে পারবে না বলে বাড়ির কাছের কলেজে ভর্তি করে দিয়েছিল। কিন্তু কী করব! কপাল খারাপ, কলেজের অচলাবস্থার কারণে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেল। ঘরে বসে থাকায় বাবা-মা তাঁর বিয়ে দিয়েছেন।’
স্থানীয় বাসিন্দা মহুবর রহমান ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘অধ্যক্ষ আসে না; ছাত্র-ছাত্রী আসে না। জাতীয় সংগীত হয় না; পতাকা তোলে না। কীভাবে চলে, আমরা বুঝি না! এ কারণে আমার ছেলেকে অন্য স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছি।’
সাবেক শিক্ষক মো. আব্দুস ছামাদ বলেন, ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করার জন্য এলাকার দরিদ্র মানুষ অনেক কষ্ট করে প্রতিষ্ঠানটি গড়েছে। কিন্তু অধ্যক্ষের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস হয়ে গেল।
স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম ক্ষোভের সঙ্গে জানান, কলেজে চাকরি পেতে অধ্যক্ষকে টাকা দিয়েছিলেন, তবু চাকরি পাননি। এখন অধ্যক্ষ টাকাও ফেরত দিচ্ছেন না। তাঁর মতো টাকা দিয়ে প্রতারিত আরও দুজন টাকা আদায়ের জন্য আদালতে মামলা করেছেন।
মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সাঈদ মো. আব্দুল ওয়াহিদ বলেন, তিনি যোগদান করার পর এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. হায়দার আলী বলেন, ‘আমি সভাপতি হওয়ার পর অধ্যক্ষকে কলেজে বসিয়ে দিয়েছি। তাঁর কাছে অনেকে টাকা পাবে– এ ভয়ে তিনি কলেজে যেতে পারেন না। তবে আমি উদ্যোগ নিয়ে অনেকের পাওনা টাকা পরিশোধ করে দিয়েছি। বর্তমানে অধ্যক্ষ এক মাসের মেডিকেল ছুটিতে রয়েছেন।’
এ বিষয়ে অধ্যক্ষ মো. মাহমুদ হাসানের ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি এ প্রতিবেদককে পরে ফোন দেবেন বলে কল কেটে দেন। পরে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও বন্ধ পাওয়া যায়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, বিষয়টি তদন্ত করা হবে। কোনো ব্যত্যয় পেলে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।