সার ডিলারদের সিন্ডিকেট, কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামের চাপে দিশেহারা বাংলাদেশের কৃষক। তাই শুধু উৎপাদন খরচই বাড়ছে না, ঝুঁকির মুখে পড়ছে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও। আগামী বোরোর ফলন নিয়েও দুশ্চিন্তায় তারা। কৃষিবিদদের মতে এখন বোরো মৌসুম। দেশের খাদ্য উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয় এবং এ মৌসুমেই উৎপাদিত হয় প্রায় সোয়া ২ কোটি টন চাল, যা সারা বছরের চালের প্রধান জোগান। বোরো পুরোপুরি বীজ, সার ও সেচনির্ভর। ফলে উপকরণের দাম বাড়লেই উৎপাদন খরচ সরাসরি বেড়ে যায়। একই সময়ে আলু, পেঁয়াজ, সরিষা ও বিভিন্ন সবজির আবাদও চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকে। তাই সারের বাজারে অস্থিরতা মানেই পুরো খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা। সরকার নির্ধারিত দাম অনুযায়ী এক বস্তা ইউরিয়ার মূল্য ১ হাজার ২৫০ টাকা। কিন্তু কৃষকদের ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৪৬০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। ডিএপি ও টিএসপির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বস্তাপ্রতি প্রায় ২০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। কেজিপ্রতি ইউরিয়া ২৭ টাকার বদলে ২ থেকে ৫ টাকা বেশি, টিএসপি ২৭ টাকার বিপরীতে ৩ থেকে ১৩ টাকা বেশি, ডিএপি ২১ টাকার জায়গায় ৭ থেকে ১৫ টাকা বেশি এবং এমওপি ২০ টাকার বদলে ৩ থেকে ৮ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বলছে, তাদের গুদামে সার রাখার জায়গা পর্যন্ত নেই। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মজুদ রয়েছে সাড়ে ৫ লাখ টন ইউরিয়া, ৩ লাখ ২১ হাজার টন টিএসপি, ৫ লাখ ৩৩ হাজার টন ডিএপি এবং ৩ লাখ ৩১ হাজার টন এমওপি। উপজেলা পর্যায়েও চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিছু সারের ক্ষেত্রে গত বছরের তুলনায় বরাদ্দ কিছুটা কম। চলতি ফেব্রুয়ারিতে টিএসপি বরাদ্দ ৭৫ হাজার ৫০০ টন, যা গত বছরের ৮০ হাজার ৮০০ টনের চেয়ে কম। ডিএপি বরাদ্দও কিছুটা কমেছে। যদিও পার্থক্য খুব বড় নয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন—ভরা মৌসুমে সামান্য ঘাটতিও বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তাছাড়া বিএডিসির স্থানীয় গুদাম কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডিলারদের আতাতের কারণে সার বেশি দামে কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, পরিবহন ঠিকাদার ও ডিলারদের একটি চক্র অবৈধভাবে সার মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। সরকারি গুদামে সার থাকলেও খুচরা পর্যায়ে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় করা হচ্ছে। একই ব্যক্তি বা তার স্বজনের নামে একাধিক ডিলারশিপ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
সার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে সরকার ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ-সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০০৯’ সংশোধন করেছে। তবে সংশোধিত নীতিমালা পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার আগেই পুরনো চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ)-এর একটি অংশ নীতিমালার বিরোধিতা করে ধীরগতিতে বাস্তবায়নের দাবি তুলেছে বলেও জানা গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় একই পরিস্থিতি। চুয়াডাঙ্গায় অভিযোগ, হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার সারের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
গাইবান্ধায় কেজিপ্রতি ৩ থেকে ৫ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে; রসিদ চাইলে সার না দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। দিনাজপুরে বরাদ্দ কম পাওয়ার অজুহাতে বাড়তি দাম আদায় করা হচ্ছে। রাজশাহীতে সরকারি দামে সার মিলছে না—এক বস্তা টিএসপি ১ হাজার ৫০ টাকার বদলে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে বিএডিসির কর্মকর্তা ও ডিলারদের যোগসাজস রয়েছে। তারা সরকারি চালান গুদামে না এনে ডিলারদের মাধ্যমে বাইরের জেলায় বিক্রি করে দিচ্ছে। তাই স্থানীয় বাজারে সারের দাম বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
সুনামগঞ্জ, যশোর, খুলনা, নওগাঁ ও বগুড়াতেও একই চিত্র। কোথাও কেজিপ্রতি ৩ থেকে ১০ টাকা বেশি, কোথাও বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে। মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে সারের দামে বড় পার্থক্যও দেখা যাচ্ছে।
কৃষিবিদরা বলছেন, দেশের মোট ধান উৎপাদনের বড় অংশই আসে বোরো মৌসুমে। এই সময়ে সারের বাজারে অনিয়ম চলতে থাকলে উৎপাদন খরচ বাড়বে, ফলনে প্রভাব পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত চালের বাজারেও চাপ তৈরি হবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, উৎপাদন খরচ বাড়তে থাকলে কৃষক ধান চাষ থেকে সরে গিয়ে বিকল্প ফসলে ঝুঁকতে পারেন। এতে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সারের বাড়তি দাম বিষয়ে কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, বেশি দামে সার বিক্রির প্রমাণ মিললে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় সরকার কঠোর থাকবে বলেও তিনি জানান। তাঁর ভাষায়, কৃষিকে বাঁচাতে হলে আগে কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।






