হাসনাত নাগাসাকি
আজকের যে এমেরিকা আমরা দেখতে পাই – এটা তাদের জন্মগত সীমানা নয়। শুরুর এমেরিকা ছিলো বর্তমান এমেরিকার ৫% এরও কম ভূখণ্ডের।
দক্ষিণে ফ্লোরিডা তাদের ছিলো না, পশ্চিমে লুসিয়ানা তাদের ছিলো না, উত্তরে কেনটুকি তাদের ছিলো না, পূর্বে নর্থ ও সাউথ ক্যারোলিনাও তাদের ছিলো না। অর্থাৎ, মিসিসিপি নদীর পূর্বে আলাবামা অঞ্চলটুকুই তাদের আদি নিবাস। বাকি অঞ্চল তারা একে একে দখল করেছে বা ক্রয় করেছে বা চুক্তির মাধ্যমে অর্জন করেছে। তাদের এই জবরদখলের ইতিহাস কয়েক শত বছরের।
শুধু পশ্চিমের কথা বললে – লস এঞ্জেলেস, ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা, উতাহ, লাস ভেগাস, এরিজোনা, নিউ ম্যাক্সিকো, টেক্সাস – এই পুরো অঞ্চল তারা জবর দখল করেছে ম্যাক্সিকোর থেকে। কৌশল ছিলো প্রথমে পূর্ব থেকে সেটেলার পাঠিয়ে এই রাজ্যগুলোতে আধিপত্য বিস্তার। তারপর সময় সুযোগ বুঝে নৃশংস দাঙ্গা বাধিয়ে দখল করে নেয়া। ১৮৪৬-৪৮ সালে যুদ্ধ করে ম্যাক্সিকোর মোট ভূমির ৭০% দখল করে নেয় এমেরিকা। সবচেয়ে বড় কথা – ম্যাক্সিকোর উর্বর ভূমি সম্পূর্ণটাই দখল করে নিয়ে ম্যাক্সিকোকে ঠেলে দেয় অনুর্বর বালু আর পাথরের দিকে। তারপর ম্যাক্সিকো আর কখনো দাঁড়াতে পারেনি, চোখ তুলে কথা বলতে পারেনি। লুসিয়ানা, ফ্লোরিডা, ক্যালিফোর্নিয়া, আটলান্টা অঞ্চলগুলো ছিলো স্পেন ও পর্তুগালের।ঊনিশ শতকের শুরুতে লুসিয়ানা কেনার পরেই মূলত তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে থাকে। তারপর ঊনিশ শতক জুড়ে ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ডকে ভয় দেখিয়ে বিতাড়িত করে এগুলো যখন লিখে নেয় – তখন স্পেন কউবা ছাড়তে রাজি হয়নি। তারা চেয়েছিলো – এই অংশে তাদের একটা কলোনি ও ঘাঁটি থাক। অই সময়ে এমেরিকা খুব দ্রুত বড় হয়ে চলছিলো। ছোট্ট এমেরিকা বিরাট হাতি হয়ে উঠলো। এবং তারা কিউবার জন্য গোঁ ধরলো। স্পেন ততোদিনে বুঝে ফেলেছে – লুসিয়ানা, ফ্লোরিডা ছেড়ে ভুল করেছে। এখন আর কিউবা ধরে রাখা সম্ভব নয়। তারা আরেকটা ভুল বুঝতে পারে – এমেরিকার সাথে যুদ্ধে ম্যাক্সিকোকে সাহায্য না করার ভুল। কিন্তু, এমেরিকা ভাবলো অন্যভাবে। তারা কৌশলে কিউবার মধ্যে গজাতে থাকা স্বাধীনতা আন্দোলনকে সাহায্য করলো। তারা ভাবলো – আগে স্পেনকে তাড়ানো যাক, পরে কউবা গিলে ফেলা আমাদের পক্ষে তুড়ির ব্যাপার। স্পেনকে তাড়িয়ে কিউবা স্বাধীন হলো। কিন্তু সেখানে জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রবল হয়ে ওঠায় এমেরিকা অঙ্গরাজ্য ঘোষণা করতে পারলো না। তার প্রধান কারণ – ম্যাক্সিকো সহ অন্যান্য ভূমি দখলের কৌশল (সেটেলার পুশিং) এখানে সম্ভব হয়নি। যাক – ১৮৯৮ সালে কিউবা মার্কিন প্রতিরক্ষার (মার্কিন সামরিক শাসন) অধীনে স্বায়ত্তশাসন পেলো। তার ৪ বছরের মাথায় কিউবা পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করে এবং স্বাধীন হয়। এই প্রথম এমেরিকা তাদের ‘ভূখণ্ড বাড়ানো’ মিশনে ব্যর্থ হলো। মুখের মধ্যে ঢুকে যাওয়া ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হলো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ১৯৫৯ পর্যন্ত সামরিক শাসনের নেতৃত্ব দিয়েছেন মার্কিন বিরোধী বাতিস্তা। এই ফাঁকে সেখানে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা গজিয়ে ওঠে এবং আরেক মার্কিন বিরোধী ‘জাতীয়তাবাদী সমাজতান্ত্রিক’’ নেতা ফিদেল কাস্ত্রো ক্ষমতায় বসে একদলীয় ‘কমিউনিস্ট শাসন’ কায়েম করেন।
১৯০২ সালে এমেরিকার দক্ষিণমুখী ভূখণ্ড বিকাশ থেমে গিয়েছিল। তার আগে উত্তরে কানাডার সাথে সীমান্ত নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। এমেরিকা যে ম্যাক্সিকোর ভূখণ্ড জবরদখলের পর আর দক্ষিণে আসতে পারেনি – তার প্রধান দেয়াল ছিলো কিউবা। দীর্ঘ সামরিক শাসন এবং ‘’কমিউনিস্ট’ শাসনের ব্যারিকেড ভেঙে দক্ষিণে প্রবেশ সম্ভব হয়নি।
২০১৬ সালে কাস্ত্রোর মৃত্যুর পর কিউবার সেই দেয়াল ভেঙে যায়। কিউবার বর্তমান প্রশাসন সম্পূর্ণভাবে মার্কিন এলাইন মেন্টেইন করে। গত কয়েক বছরে কিউবান প্রশাসনের নিরব সম্মতিতে কিউবাতে মার্কিন সংস্কৃতি, চিন্তাধারার ব্যাপক চাষাবাদ হয়েছে। কৌশলগতভাবেও এমেরিকার সমান্তরালে চিন্তা করে বর্তমান কিউবা। এমনকি – আগামীকাল সকালে ঘুম থেকে জেগে যদি শোনেন – কিউবা নিজেকে এমেরিকার অধীন ঘোষণা করেছে – তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। অর্থাৎ, দীর্ঘ ১২০ বছর পরে এসে এমেরিকার কিউবা দখল আংশিক সফল হয়েছে। আংশিক বলছি, কারণ – জাতীয়তাবাদী চেতনা সাধারণত সুপ্ত থাকে। যদিও – উনবিংশ শতকের জবরদখল আর একবিংশ শতকের জবরদখলের রূপ একরকম হবে না। কিউবার ‘দেয়াল’ ভেঙে পড়ার পর এমেরিকার দক্ষিণমুখী আগ্রাসনে আর বাধা থাকলো না। ল্যাতিন এমেরিকা এমেরিকার সবচেয়ে নিকটতম ভূখণ্ড এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত হওয়ার পরও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এমেরিকার চোখ আটকে ছিলো ইউরোপ এবং এশিয়ার দিকে। তার প্রধান কারণ – বিশ শতকের তেল গ্যাসের যত খনি আবিষ্কার হয়েছিল – তার বেশিরভাগ মধ্যপ্রাচ্যে এবং বিশ্বযুদ্ধোত্তর অর্থনীতির বড় অংশ ইউরোপে।
শেষ কয়েক দশকে এমেরিকা এসব অঞ্চলে তাদের আধিপত্য পাকাপোক্ত করেছে। এশিয়া এবং ইউরোপের অধিকাংশ মার্কিন বলয়ভুক্ত। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড সম্পূর্ণ মার্কিন বলয়ভুক্ত।
প্রশান্ত এবং আটলান্টিকের বেশিরভাগ তাদের আধিপত্য। মধ্যপ্রাচ্য থেকে হাতিয়ে নেয়া বিপুল তেলের সঞ্চয় আছে তাদের। তার উপর সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের তেল গ্যাস আবিষ্কার হয়েছে। এবার বাকি তাদের সীমানা বৃদ্ধি করা। হ্যাঁ, একবিংশ শতকে সীমানা বৃদ্ধি হয়তো ঊনবিংশ শতাব্দীর মতো হবে না। হয়তো নামমাত্র ‘’দেশীয় প্রতিনিধি’’ বসানো হবে ক্ষমতার চেয়ারে এবং সাংস্কৃতিক ও চিন্তাধারার চাষাবাদের মাধ্যমে অন্যরকম মার্কিনীকরণ করা হবে। কিন্তু, কিউবার মতো করে গ্রাস করার চেষ্টা করা হবে ভেনেজুয়েলা এবং ‘’ওয়েস্ট ইন্ডিজ’কে। পুরো ল্যাতিন এমেরিকা প্রয়োজন নেই মার্কিনীদের। কিউবা তো হাতের মুঠে। পানামাও হাতের বাইরে নয়। ক্যারিবিয়ান সাগরের অন্যান্য দেশ ( ওয়েস্ট ইন্ডিজ – যেটা মূলত ছোট ছোট অনেকগুলো দ্বীপরাষ্ট্র) এমেরিকার এলাইনে আছে। কেবল হাতের বাইরে আছে আংশিকভাবে কলম্বিয়া, সম্পূর্ণভাবে ভেনেজুয়েলা। এই দুইটা দেশের ঘাড় মটকে নিজের অধীনে নিয়ে নিলে পুরো ক্যারিবিয়ান অঞ্চল মার্কিন ‘’দখলে’ চলে আসে। একবিংশ শতকে এটা ভৌগোলিক সীমানা বৃদ্ধি না করলেও রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও চিন্তাধারার আধিপত্যের মাধ্যমে একরকম একীভূত করে নেয়া বুঝাবে।