সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডার না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকরা। ডিসেম্বরের শেষ দুই সপ্তাহ ধরে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম হঠাৎ বেড়ে কোথাও ১ হাজার ৮০০ টাকা, কোথাও আবার ২ হাজার টাকার বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত ২৪ ডিসেম্বর সকালে এলপিজি শেষ হয়ে যাওয়ার পর রাজধানীর ধানমণ্ডি এলাকার বাসিন্দা জুয়েল হোসেন আশেপাশের এলাকায় একাধিক দোকানে ফোন করেন। তবে কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে আরেকটি দোকানে একটি সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও দাম দিতে হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। কাওসার খান বলেন, হঠাৎ এমন দাম বৃদ্ধি চিন্তাই করা যায় না। কল্যাণপুর নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা ফারজানা নীলা জানান, গত ৩০ ডিসেম্বর তিনি একাধিক দোকানে খোঁজ করেও এলপিজি পাননি। পরে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার পেলেও দাম দিতে হয়েছে ১ হাজার ৮০০ টাকা। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ টাকার বেশি দিতে হয়েছে বলে জানান তিনি। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান মিরপুর কাজীপাড়ার বাসিন্দা আসমা আখতার। তিনি বলেন, ৩১ ডিসেম্বর একাধিক দোকানে খোঁজ করেও ১ হাজার ৮০০ টাকায় এলপিজি পাননি। শেষ পর্যন্ত ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে দিতে হয়েছে ২ হাজার ১০০ টাকা। অথচ ডিসেম্বরে সরকার নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা।
গৃহস্থালিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম টানা দুই সপ্তাহ ধরে বাড়ছে। ঢাকার চারটি খুচরা দোকানের বিক্রেতারা জানিয়েছেন, তাঁরা চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি পাচ্ছেন না। সরবরাহ কম থাকায় গ্রাহকদের চাহিদা থাকলেও সিলিন্ডার দিতে পারছেন না। ফলে যাঁরা পাচ্ছেন, তাঁদের বাড়তি দাম দিয়েই কিনতে হচ্ছে।
সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার পরিবেশক সমিতির সভাপতি সেলিম খান বলেন, অধিকাংশ কোম্পানি সরবরাহ সীমিত রেখেছে। ১ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা দিলে ২০০ থেকে ৩০০টির বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে।
তিনি জানান, কোম্পানিগুলো প্রতি সিলিন্ডারে ৭০ থেকে ৮০ টাকা বাড়তি দাম নিচ্ছে। তবে খুচরা পর্যায়ে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বাড়তি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিইআরসি ও এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সূত্র জানায়, শীত মৌসুমে বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা বাড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এলপিজি আমদানির জাহাজসংকট। নিয়মিত এলপিজি পরিবহনের ২৯টি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়ায় পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে।
এতে ডিসেম্বর মাসে এলপিজি আমদানি কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০ হাজার টনে, যেখানে গড়ে প্রতি মাসে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টন আমদানি হয়ে থাকে।
লোয়াবের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও এনার্জিপ্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশীদ জানান, ডিসেম্বরে এলপিজি আমদানি কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। সরবরাহ সংকটের কারণেই বাজারে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে কোম্পানিগুলো পরিবেশকদের কাছে বিইআরসি নির্ধারিত দামে এলপিজি সরবরাহ করছে বলে দাবি করেন তিনি।
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ডিসেম্বর মাসে প্রতি কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয় ১০৪ টাকা ৪১ পয়সা, সে হিসাবে ১২ কেজির দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা।
বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়ায় বিইআরসি এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন লোয়াবকে চিঠি দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেছে। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, কাগজে-কলমে বাড়তি খরচ প্রমাণিত হলে মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তার আগে বাড়তি দামে বিক্রির কোনো সুযোগ নেই।
এদিকে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, সরবরাহ সংকটের অজুহাতে বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। বেশি দামে বিক্রি আইনত অপরাধ হলেও কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, যা ভোক্তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।