স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক
হামের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় সর্বস্ব বিক্রি করে দিয়েও অনেক নিম্নবিত্ত বাবা-মা তাঁদের সন্তানকে বাঁচাতে পারছেন না। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনার অবিরাম প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। অক্সিজেন, ওষুধ ও জরুরি যন্ত্রপাতির জন্য লাখ টাকা খরচ করেও শেষ রক্ষা হয়নি অনেক পরিবারের।
কক্সবাজারের পর্যটন সৈকতে পর্যটকদের ছবি তুলে সংসার চালাতেন আলোকচিত্রী মোহাম্মদ আলম। আদরের ৯ মাস বয়সী মেয়ে সুরাইয়ার চিকিৎসার জন্য একমাত্র সম্বল—ক্যামেরাটি বিক্রি করে দেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার থেকে চমেক হাসপাতালে লড়াই করছিলেন সুরাইয়াকে নিয়ে। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, শিশুটি হাম-পরবর্তী জটিলতা ‘মিজেলস এনসেফালাইটিস’ (মস্তিষ্কের প্রদাহ)-এ আক্রান্ত।শ্বাসকষ্ট তীব্র হলে চিকিৎসকরা ‘হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা’ সার্কিট কিনে আনতে বলেন। বাজারে দুর্লভ এই যন্ত্রাংশের জন্য এক কোম্পানির প্রতিনিধির কাছে অনুনয় করেছিলেন আলম। সাড়ে ১১ হাজার টাকার স্লিপ হাতে নিয়ে ছুটে আসার আধা ঘণ্টার মধ্যেই সুরাইয়া মারা যায়। আইসিইউর সামনে মা’র গগনবিদারী চিৎকারে স্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ।
আলম বলেন, “আইসিইউতে কেন এই জরুরি সরঞ্জাম থাকবে না? আমার বাচ্চাটা বিনা চিকিৎসায় মারা গেল!”
রাঙ্গুনিয়ার রিকশাচালক রহিম উদ্দিনের ২ বছরের ছেলে আরিফ হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দুই সপ্তাহ ধরে চমেক হাসপাতালে ভর্তি। চিকিৎসায় সবকিছু বিক্রি করে দিয়েছেন—ঘরের একমাত্র গরুটি, স্ত্রীর সোনার নাকছাবি ও অন্যান্য জিনিসপত্র। এখনো আরিফ আইসিইউতে লড়ছে। রহিম উদ্দিন বলেন, “আর কিছু বেচার নেই ভাই। যা ছিল সব দিয়েছি। এখন শুধু আল্লাহর কাছে চাই।”
হাটহাজারীর দিনমজুর দম্পতি তাদের ১১ মাস বয়সী মেয়ে রিয়ার চিকিৎসায় প্রায় ৭৫ হাজার টাকা খরচ করেছেন। ধারদেনা করে টাকা জোগাড় করতে হয়েছে। মেয়ের অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক। মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “হামের টিকা তো দিতে পারত। আমরা গরিব বলে কি আমাদের বাচ্চাগুলোর কোনো দাম নাই?”
ঢাকা ও অন্যান্য জেলায় একই চিত্রঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালেও অনুরূপ ঘটনা ঘটছে। টাঙ্গাইল থেকে আসা এক বাবা পাঁচ দিন ধরে ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন। তিনি জানান, “আমরা ক্লান্ত, চিন্তায় অস্থির। আর কিছু নেই, শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা।” অনেক পরিবার সঞ্চয়, ধার-দেনা ও সম্পত্তি বিক্রি করে চিকিৎসা চালাচ্ছেন।
হাসপাতালে সংকট বাড়ছে চমেক হাসপাতালে গত কয়েক ঘণ্টায় একাধিক শিশু মারা গেছে। আইসিইউতে এখনো অনেক শিশু মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। হাই ফ্লো মেশিনের অভাব, নষ্ট সরঞ্জাম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। দেশব্যাপী হামের প্রাদুর্ভাবে শত শত শিশু মারা গেছে এবং লক্ষাধিক আক্রান্ত।নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো এখন শুধু প্রশ্ন করছে—টিকাদান কর্মসূচিতে অবহেলার কারণে তাদের সন্তানদের বাঁচাতে আর কত সর্বস্ব খোয়াতে হবে? স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো টিকাদান না করলে এই মূল্য শুধু অর্থ দিয়ে নয়, জীবন দিয়েও শোধ করতে হচ্ছে।






