স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক
বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবে শত শত শিশুর মৃত্যুর পেছনে টিকার ঘাটতিকে দায়ী করা হচ্ছে। আর এই ঘাটতির বিষয়ে বিগত ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ বাংলাদেশ।
শুধু মৌখিক আলোচনাই নয়, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কাছে দাপ্তরিক চিঠিও পাঠিয়েছিল সংস্থাটি। তবু কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে হামের মহামারি, প্রাণ হারায় শত শত শিশু।
ইউনিসেফের সতর্কবার্তা ও চিঠি
হামের টিকার সংকট নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে আগে আলোচনা হয়েছিল কিনা — এমন প্রশ্নের জবাবে ইউনিসেফ বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে বলেছে, “হ্যাঁ। অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বের সঙ্গে ইউনিসেফ বহুবার আলোচনায় যুক্ত হয়েছিল। এবং মজুদ শেষের ঝুঁকি, রোগ বিস্তার, জটিলতা ও শিশু মৃত্যুর আশঙ্কা জানিয়ে সতর্ক করে দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে ওই বৈঠকগুলোর ফলো-আপ করা হয়েছিল।”
এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো চলতি বছরের ১০ই ফেব্রুয়ারি পাঠানো একটি সরকারি চিঠি। বাংলাদেশে টিকার আসন্ন ঘাটতির বিষয়ে সতর্ক করে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে এই চিঠিটি পাঠান ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।
চিঠিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়। বলা হয়, হাম-রুবেলার এমআর৫ টিকার মেয়াদ ৫ই ফেব্রুয়ারিতেই শেষ হয়ে গেছে। পোলিওর বিওপিভি টিকার মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে ১৫ই ফেব্রুয়ারি, টিটেনাস ও ডিপথেরিয়ার টিডি টিকার ২২শে ফেব্রুয়ারি এবং যক্ষ্মার বিসিজি টিকার মেয়াদ শেষ হবে ২৮শে ফেব্রুয়ারি।
চিঠিতে আরও সতর্ক করা হয় যে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তা নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাবে এবং টিকায় প্রতিরোধ করা যায় এমন রোগ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
কেন তৈরি হলো এই সংকট
২০২৪ সাল পর্যন্ত ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় টিকা আনত সরকার, যেখানে অর্থায়নের মূল উৎস ছিল দাতাদের সহায়তা। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এই পদ্ধতি পরিবর্তন করে রাজস্ব বাজেটের আওতায় উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় টিকা কেনার পথে যায়।
এই পদ্ধতিতে টিকা কিনতে আট থেকে এগারো মাস সময় লাগে বলে ইউনিসেফ জানিয়েছে। এ ছাড়া জুলাইয়ের বিরূপ পরিস্থিতি এবং টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনও টিকা কার্যক্রম ব্যাহত করে।
ইউনিসেফ জানিয়েছে, রাজস্ব বাজেটে যাওয়া এবং উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়াসহ ক্রয় পদ্ধতির দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তনের কারণে টিকা পেতে দেরি হয়েছে এবং এটি যে টিকার সরবরাহ-শৃঙ্খলকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, সে বিষয়ে আগেভাগেই সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ ও অন্য অংশীদাররা।
উল্লেখযোগ্যভাবে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকও ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনার জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, কারণ উন্মুক্ত দরপত্রের কেনাকাটায় সময়মত টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি থেকে যায়।
মৃত্যুর তথ্য ও দায়ের প্রশ্ন
চলতি বছরের ১৫ই মার্চ থেকে ১৫ই মে পর্যন্ত হাম ও হামের লক্ষণ নিয়ে দেশে ৪৫১ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, যার মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ৭৪ জনের। এর আগে জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার সময়ই মূলত দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয় এবং মার্চ নাগাদ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ নেয়।
চিকিৎসকদের সংগঠন ‘ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ বলেছে, হামে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এবং প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমানকে ফোনে পাওয়া যায়নি। এসএমএস পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।
নতুন সরকারের পদক্ষেপ
রোগ ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্যাভি ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারসহ অন্য অংশীদারদের সহযোগিতায় জরুরি ভিত্তিতে উদ্যোগ নেয়।
যদিও শুরুর দিকে এই মহামারির সমস্ত দায় আওয়ামী লীগ সরকারের ঘাড়ে চাপান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান থেকে শুরু করে তার সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ অনেক মন্ত্রী এবং দায়িত্বশীলরা। কিন্তু সচেতন মহল এবং বিভিন্ন সংস্থা ডাটা তুলে ধরে প্রমাণ করতে সমর্থ হন এর পুরো দায়ভার ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের। যা নীরবে মেনে নিতে বাধ্য হয় বিএনপি সরকার।
৩০টি উচ্চ-ঝুঁকির উপজেলায় ৫ই এপ্রিল জরুরি টিকা অভিযান শুরু হয়, যা পরে জাতীয় হাম কর্মসূচি হিসেবে বিস্তৃত করা হয়। ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম গত ১০ই মে শতভাগের কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে বলে ইউনিসেফ জানিয়েছে।
ইউনিসেফ আরও জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চের শুরু থেকে সরকার গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে জরুরি হাম-রুবেলা টিকা অভিযান এবং ইউনিসেফের ক্রয়-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে টিকা কেনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।
আগামীতে সময়মত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করতে ইউনিসেফের মাধ্যমে কেনার প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়াকে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি সরকার।






