নওগাঁ জেলার প্রাচীন প্রশাসনিক ইউনিটগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো রাণীনগর থানা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ১৮৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই থানা শুধু প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং উত্তরাঞ্চলের ইতিহাস, যোগাযোগ ও জনজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে আছে।
রাণীনগর নামের উৎপত্তি নিয়ে স্থানীয়ভাবে দুটি জনপ্রিয় জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে।
সবচেয়ে পরিচিত মত অনুযায়ী, নাটোরের প্রখ্যাত জমিদার রানী ভবানী—যিনি “অর্ধবঙ্গেশ্বরী” নামে পরিচিত ছিলেন—তাঁর বাবার বাড়ি ছাতিয়ানগ্রামে যাওয়ার পথে বর্তমান রাণীনগর বাজার এলাকায় যাত্রাবিরতি ও বিশ্রাম নেন। পরবর্তীকালে রানীর সেই অবস্থানের স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই এলাকাটির নাম হয় “রাণীনগর”।
অন্যদিকে, ইতিহাসভিত্তিক আরেকটি মত বলছে, ১১শ থেকে ১২শ শতকে এ অঞ্চলে পাল বংশীয় প্রভাবশালী জমিদার খট্টেশ্বর রাজা শাসন করতেন। তাঁর সম্মানিত রানীর নাম অনুসারেই মৌজাটির নামকরণ হয় “রাণীনগর” এবং রাজার নাম অনুসারে গড়ে ওঠে “খট্টেশ্বর পরগনা”। আজও উপজেলার ১ নম্বর ইউনিয়নের নাম “খট্টেশ্বর রাণীনগর”। ব্রিটিশ আমলের সেটেলমেন্ট রেকর্ডেও পরগনার নাম “খট্টেশ্বর” এবং মৌজার নাম “রাণীনগর” হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
পাল রাজাদের ঐতিহাসিক প্রভাবের স্মৃতি ধরে রাখতে এখনও এলাকায় রয়েছে “খট্টেশ্বর রাণীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়” এবং “খট্টেশ্বর রাণীনগর পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদ”।
যদিও খট্টেশ্বর পরগনার ঐতিহাসিক ভিত্তি বহু পুরোনো, আধুনিক রাণীনগরের বিকাশ মূলত ১৮৫৬ সালে থানা প্রতিষ্ঠার পর থেকেই গতি পায়। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে এখানে জনবসতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ ঘটে।
এরপর ১৯২৫ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত হয় রাণীনগর রেল স্টেশন। রেল যোগাযোগ চালুর পর খট্টেশ্বর রাণীনগর বাজার দ্রুত উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। সম্প্রতি স্টেশনটির শতবর্ষও উদযাপিত হয়েছে, যা স্থানীয় মানুষের কাছে ঐতিহ্যের এক বিশেষ মাইলফলক।
পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে রাণীনগর থানাকে কেন্দ্র করেই গঠিত হয় রাণীনগর উপজেলা। প্রায় ২৫৮ দশমিক ৩৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলায় বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের বসবাস।
একসময় আত্রাই-রাণীনগর অঞ্চলে চরমপন্থী তৎপরতা ছিল উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ সময় ধরে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগে পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে।
বর্তমানে এলাকায় সড়ক ছিনতাই, চুরি, প্রতারণা, মাদক, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধ প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। স্থানীয়দের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের সক্রিয় তৎপরতায় জনমনে নিরাপত্তাবোধও বেড়েছে।
প্রাচীন পরগনা, জমিদারি ইতিহাস, ব্রিটিশ প্রশাসন, রেল যোগাযোগ এবং আধুনিক উপজেলা কাঠামো—সব মিলিয়ে রাণীনগর শুধু একটি প্রশাসনিক এলাকা নয়; এটি উত্তরবঙ্গের ইতিহাস ও সামাজিক পরিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল।