বিশেষ প্রতিবেদক
ঢাকা, মঙ্গলবার: ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সংঘটিত ঘটনার দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করা এবং এ ঘটনার প্রকৃত ইতিহাস জাতীয় শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করাসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। একইসঙ্গে সংগঠনটি দীর্ঘদিনের অসমাপ্ত ১৩ দফা দাবির বাস্তবায়নেরও দাবি জানিয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর লালবাগের হাজি আবদুল আলীম ঈদগাহ মাঠে (আজাদ মাঠ) হেফাজতের লালবাগ জোনের আয়োজিত সমাবেশে এ দাবিগুলো জানানো হয়। শাপলা চত্বরে গণহত্যার বিচার, আলেমদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার ও ১৩ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে পাঁচ দফা দাবি ঘোষণা করেন হেফাজতে ইসলাম লালবাগ জোনের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা বশিরুল হাসান খাদেমানি। পাঁচ দাবির অন্যগুলো হলো, শাপলা চত্বরের ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান; আহত ব্যক্তিদের পূর্ণ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা; আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে করা সব মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার; এবং হেফাজত ঘোষিত ১৩ দফা দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
২০১৩ সালের হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি:
১. সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিল করা।
২. আল্লাহ, রাসুল (সা.) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস করা।
৩. কথিত শাহবাগি আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদ এবং প্রিয় নবী (সা.)-এর শানে জঘন্য কুৎসা রটনাকারী ব্লগার ও ইসলামবিদ্বেষীদের সব অপপ্রচার বন্ধসহ কঠোর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করা।
৪. ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে সব বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বালনসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করা।
৫. ইসলামবিরোধী নারীনীতি, ধর্মহীন শিক্ষানীতি বাতিল করে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা।
৬. সরকারিভাবে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা এবং তাদের প্রচারণা ও ষড়যন্ত্রমূলক সব অপতৎপরতা বন্ধ করা।
৭. মসজিদের নগর ঢাকাকে মূর্তির নগরে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করা।
৮. জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের সব মসজিদে মুসল্লিদের নির্বিঘ্নে নামাজ আদায়ে বাধাবিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং ওয়াজ-নসিহত ও ধর্মীয় কার্যকলাপে বাধাদান বন্ধ করা।
৯. রেডিও-টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাড়ি-টুপি ও ইসলামি কৃষ্টি-কালচার নিয়ে হাসিঠাট্টা এবং নাটক-সিনেমায় নেতিবাচক চরিত্রে ধর্মীয় লেবাস-পোশাক পরিয়ে অভিনয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মনে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব সৃষ্টির অপপ্রয়াস বন্ধ করা।
১০. পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও এবং খ্রিস্টান মিশনারিগুলোর ধর্মান্তরকরণসহ সব অপতৎপরতা বন্ধ করা।
১১. রাসুলপ্রেমিক প্রতিবাদী আলেম-ওলামা, মাদ্রাসার ছাত্র ও তৌহিদি জনতার ওপর হামলা, দমন-পীড়ন, নির্বিচার গুলিবর্ষণ এবং গণহত্যা বন্ধ করা।
১২. সারা দেশের কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, ওলামা-মাশায়েখ ও মসজিদের ইমাম-খতিবকে হুমকি-ধমকি, ভয়ভীতি দানসহ তাদের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র বন্ধ করা।
১৩. অবিলম্বে গ্রেপ্তারকৃত সব আলেম-ওলামা, মাদ্রাসাছাত্র ও তৌহিদি জনতাকে মুক্তিদান, দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং আহত ও নিহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণসহ দুষ্কৃতকারীদের বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে হেফাজত ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা আবদুল হামিদ (পীর সাহেব মধুপুর) বলেন, ‘ইমামত আমাদের ছিল, আমাদের কাছে আবার ফেরত আসবে। যারা মাঝখানে আছে (বর্তমান সরকার) আল্লাহওয়ালাদের সঙ্গে, দ্বীনদারদের সঙ্গে থাকলে তাদের জন্য ভালো হবে। ভালো খবর। তা যদি না হয়, আগে যা হয়েছে, তা–ই হবে। যে দুর্দশা আগে হয়েছে, কেয়ামতের আগপর্যন্ত এটাই হবে। হেফাজতে ইসলাম ছিল, আছে, ইনশা আল্লাহ থাকবে।’
সমাবেশে হেফাজত নেতারা আরও বলেন, ২০১৩ সালের অসমাপ্ত দাবিগুলো এখন বাস্তবায়নের সময় এসেছে। শাপলা চত্বরের ঘটনার ন্যায়বিচার ছাড়া দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলে তারা মনে করেন।
২০১৩ সালের প্রেক্ষাপট:
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরুর পর ইসলামপন্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ১৩ দফা দাবি ঘোষণা করে এবং ৫ মে ২০১৩ তারিখে ঢাকায় মহাসমাবেশের ডাক দেয়।
ওইদিন মতিঝিলের শাপলা চত্বরসহ আশপাশের এলাকায় লাখো কর্মী-সমর্থক জড়ো হয়ে রাজধানীকে অবরুদ্ধ করে ফেলে, এবং মতিঝিল এলাকা জুড়ে সহিংসতা ও অরাজকতার সৃষ্টি করে। ৫ই মে রাতে সরকারের নির্দেশে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে শাপলা চত্বর খালি করা হয়, যাতে হেফাজতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং অনেকে প্রাণ হারান বলে দাবি ওঠে। একই সময়ে সরকার শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের কর্মসূচির বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেয় এবং আন্দোলন স্থানের মঞ্চ ও নেরাপত্তা বেষ্টনি তুলে নেই একইরাতে।

দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বিভিন্ন ইসলামিক সংগঠন ও মাদ্রাসাপন্থীরা ৫ইমে রাতে শাপলা চত্ত্বরে হাজার হাজার মাদ্রাসা ছাত্র হত্যার দাবী করে আসলেও আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত মতে সেই সংখ্যা ১৬ বলা হলেও কিছুদিন আগে বিএনপি সরকার এই সংখ্যাকে ৩২ জন বলে উল্লেখ করে, যার সবই ঘটে ঢাকার বাইরে।







