science.org-এর প্রতিবেদন অবলম্বনে
বাংলাদেশ এখন ভয়াবহ হামের মহামারির কবলে। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী Science.org-এ প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই সংকটের পেছনের কারণ — অন্তর্বর্তী সরকারের একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, যার বিরুদ্ধে আগেই সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ।
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ?
চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে এ পর্যন্ত ৩২,০০০-এরও বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং মারা গেছে ২৫০-এর বেশি মানুষ, যাদের অধিকাংশই শিশু। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে শিশুদের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়েছে, কারণ শয্যা সংকট ছিল তীব্র। মহামারিটি দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টিতে ছড়িয়ে পড়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২১,০০০-এরও বেশি রোগী।
কীভাবে শুরু হলো এই সংকট?
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ টিকাদানের হারের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত ছিল। শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা (MR) টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হতো, এবং প্রতি ৪ বছরে জাতীয় টিকাদান অভিযান চালানো হতো যাতে ৯৫% কভারেজ নিশ্চিত থাকে — যা মহামারি ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয় সীমা।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন হলে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে।
যে সিদ্ধান্ত বিপদ ডেকে আনল
Science.org-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনূসের সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করে দিয়ে “ওপেন টেন্ডার” পদ্ধতিতে চলে যায়। এই পদ্ধতিতে সরকার সরবরাহকারীদের কাছ থেকে দরপত্র আহ্বান করে এবং মূল্যায়নের পর অর্ডার দেয়।
ইউনিসেফ এই পরিবর্তনের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, তিনি বারবার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছিলেন। অন্তর্বর্তী স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম কে তিনি সরাসরি বলেছিলেন:
তবে নূরজাহান বেগম এই সংক্রান্ত অভিযোগের বিপরীতে Science.org-এর প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি।
টেন্ডার প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়, দীর্ঘসময় ধরে গড়ে ওঠা টিকার সরবরাহ ব্যাবস্থাপনা ধ্বংস হয়ে যায় এবং সারাদেশে টিকার মজুদ শেষ হয়ে পড়ে।
২০২৪ সালে পরিকল্পিত জাতীয় টিকাদান অভিযানটি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৫-এ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল — পরে সেটি বাতিল করা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯% শিশু হামের টিকা পেয়েছে — যে তথ্য পরে সরকারের ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
মহামারি কোথা থেকে শুরু?
এ বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্তের কাছে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির থেকে প্রথম প্রাদুর্ভাব শুরু হয় এবং দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২৩ এপ্রিল হালনাগাদ তথ্যে মিয়ানমার ও ভারতেও ছড়িয়ে পড়ার “উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি” সম্পর্কে সতর্ক করেছে।
মৃত্যু কেন এত বেশি?
শুধু টিকা সংকট নয়, উচ্চ শিশু অপুষ্টি পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করেছে। ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ২৮% শিশু খর্বকায় এবং ১০% তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। ২০২৪ সাল থেকে তিনটি ভিটামিন এ বিতরণ অভিযানও বাদ পড়েছে। IEDCR-এর সাবেক বিজ্ঞানী এ এস এম আলমগীর বলেন, এই ঘাটতিগুলো মিলিয়ে পরিস্থিতি মারাত্মক হয়ে উঠেছে।
হাম একসময় বিশ্ব থেকে নির্মূলের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকাদান ব্যাহত হওয়া, যুদ্ধ ও ভ্যাকসিন-বিরোধী মনোভাবের কারণে বিশ্বজুড়ে হাম ফিরে আসছে। কানাডা ও বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ সম্প্রতি তাদের “হামমুক্ত” মর্যাদা হারিয়েছে।
IEDCR-এর উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন বলেন, “টিকাদানের ঘাটতির বাইরেও, বাংলাদেশের হামের সংকট দেশের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতাকে প্রতিফলিত করে।”
তবে, বর্তমানে হাম যে গতিতে ছড়াচ্ছে, তাতে এই জরুরি টিকাদান কর্মসূচি দ্রুত মহামারি থামাতে পারবে না বলে সতর্ক করেছেন বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক বেনজির আহমেদ। তিনি বলেন, “এই হারে টিকা দেওয়া হলে সংক্রমণ এখনই কমবে না।”
হুসাইন বলেন, সংকটের তীব্রতা তুলে ধরতে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণে তাগিদ দিতে সরকারের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা উচিত। হুসাইন বলেন, “এটি ইতিমধ্যেই একটি জরুরি অবস্থা। তাহলে আনুষ্ঠানিকভাবে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে দ্বিধা কেন?”
সায়েন্স-এর সাথে কথা বলা অনেক বিজ্ঞানীই অন্তর্বর্তী সরকারের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যা আইনি তদন্তের আওতায়ও এসেছে। গত ১২ এপ্রিল, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দুর্নীতি এবং টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি অভিযোগ দায়ের করেন।
ইউনিসেফ এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স ফ্লাওয়ার্সও একমত যে,
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং অন্তর্বর্তী সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সায়েদুর রহমান বলেন, পুরোনো ক্রয় ব্যবস্থাটি পরিবর্তন করা প্রয়োজন ছিল, কারণ এটি জরুরি অবস্থার জন্য তৈরি একটি আইনি ধারার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। ‘সায়েন্স’ পত্রিকাকে পাঠানো এক ইমেইলে তিনি লিখেছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকার এটিকে “ভবিষ্যতে একটি নিয়মিত, নিয়ম-ভিত্তিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন করতে” চেয়েছিল, যাতে “স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে বা পক্ষপাতিত্বের ধারণা তৈরি না হয়।”
ঠিক কী ভুল হয়েছিল, সে বিষয়ে পরবর্তী প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিলেও সায়েদুর রহমান এই সংকটের মানবিক ক্ষতির কথা স্বীকার করেছেন। রহমান লিখেছেন,
“হামের মতো সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে শিশুদের মৃত্যু হৃদয়বিদারক। এটি একটি মানবিক বিপর্যয়, এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা রইল।”
তথ্যসূত্র: Science.org (science.org)






