বিশেষ প্রতিবেদক
ঢাকা, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার ভবিষ্যতে আরও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে ইউনূসের আরোপিত মার্কিন-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি (Agreement on Reciprocal Trade)। একই আশঙ্কা থাকবে বিদ্যমান রুপপুর প্রকল্পের জন্য জ্বালানী হিসাবে ফ্রেশ ইউরেনিয়াম সংগ্রহে।
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির Article 4.3 ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে,
“বাংলাদেশ কোনো দেশ থেকে নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর, ফুয়েল রড বা এনরিচড ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না,
যদি সেই দেশ “যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাবশ্যকীয় স্বার্থের” (jeopardises essential US interests) জন্য হুমকি হয়।”
যদিও কোনো দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, তবে নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা একমত যে, এই ধারাটি মূলত রাশিয়াকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও কোন নির্দিষ্ট দেশের নাম না থাকায়, যুক্তরাষ্ট্রের যে কোন আপত্তির পথটি উন্মুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রূপপুর রাশিয়ার অর্থায়নে ও রোসাটমের কারিগরি সহায়তায় নির্মিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে রূপপুরের নতুন কোনো ইউনিট যুক্ত করতে হলে, বা মজুত শেষে জ্বালানির প্রয়োজনে রাশিয়ার কাছ থেকে রিয়্যাক্টর, ফুয়েল রড ও ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু নতুন মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির শর্ত অনুসারে এ ধরনের লেনদেন করলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের উপর ৩৫-৩৭% পুনরায় শুল্ক আরোপ করতে পারে এবং বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে।
ভারতের তামিলনাড়ুতে রাশিয়ার একই প্রতিষ্ঠান রোসাটমের কারিগরি সহয়তায় ২০০২ সালে পারমানবিক বিদ্যুতকেন্দ্রের ১ম ও ২য় ইউনিটের কাজ শুরু হয়। পরবর্তিতে সেই চুক্তি বর্ধিত হয়ে প্রকল্পে ৩য় ও ৪র্থ এবং ৫ম ও ৬ষ্ঠ নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর যুক্ত হয়। ১০০০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট দিয়ে শুরু এই বিদ্যুতকেন্দ্র এতোটাই সুলভ ও স্বাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে যে, ১৫-২০ বছরের মধ্যে আরও ৫টি ইউনিট যুক্ত হয়ে প্রকল্পের বর্তমান ক্যাপাসিটি দাঁড়িয়েছে ৬০০০ মেগাওয়াট। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে রুপপুর প্রকল্প বর্ধিতকরনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে এই “মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি”।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর এম তামিম বলেন,
“যদি চুক্তির কারণে রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম বা ফুয়েল রড আমদানি বন্ধ হয়ে যায়,
তাহলে রূপপুর কেন্দ্রই চালানো কঠিন হয়ে পড়বে, আর ভবিষ্যতের নতুন পারমাণবিক প্রকল্প তো দূরের কথা।”
এই চুক্তি শুধু রাশিয়ার সাথেই নয়, চীনের সাথেও ভবিষ্যৎ পারমাণবিক সহযোগিতাকে জটিল করে তুলতে পারে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র চীন ও রাশিয়াকে “non-market economy” হিসেবে বিবেচনা করে।
বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ
রূপপুরের জন্য রাশিয়া থেকে জ্বালানি হিসাবে ফ্রেশ নিউক্লিয়ার ফুয়েল (ইউরেনিয়াম) সরবরাহের নির্ভরযোগ্য উৎস। ২০২৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর প্রথম, ৬ অক্টোবর দ্বিতীয়, ১৩ অক্টোবর তৃতীয় আর ২০শে অক্টোবর চতুর্থ দফায় রাশিয়া থেকে প্রথম ব্যাচের ফ্রেশ নিউক্লিয়ার ফুয়েল বা ইউরেনিয়াম বাংলাদেশে এসে পৌছেছিল। বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে চুক্তি অনুসারে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর ৩ বছরের জন্য জ্বালানির দাম দিতে হবে না। তিন বছর পর থেকে বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে ফ্রেশ ইউরেনিয়াম কিনবে, এবং রাশিয়া সেই ইউরেনিয়াম সরবরাহ করবে।
রূপপুর প্রকল্পে দুটি VVER-1200 ইউনিটে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাবস্থা রয়েছে। প্রতি ইউনিটে জ্বলানির মজুতঃ
- প্রথম ইউনিটের Initial Core (প্রথম লোড):
১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি লোড করা হচ্ছে (২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে)।
এতে মোট প্রায় ৮৭ টন UO₂ (ইউরেনিয়াম ডাই-অক্সাইড) রয়েছে। - দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য:
একই পরিমাণ (প্রায় ৮৭ টন) ইউরেনিয়াম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
রুপপুরে এই দুইটি ইউনিটে বার্ষিক রিফুয়েলিং এর পরিমান, একটি ইউনিটের জন্য প্রতি বছর গড়ে ২০–২৫ টন enriched uranium হিসাবে, দুটি ইউনিটের জন্য বছরে প্রায় ৪০–৫০ টন ইউরেনিয়াম প্রয়োজন হবে। মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির Article 4.3 ধারা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে রুপপুর প্রকল্পের জ্বালানি হিসাবে ইউরেনিয়াম সংগ্রহ অনিশ্চিতার সন্মুখীন।
বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানী সংগ্রহ বা প্রকল্প নির্মানের প্রতিবন্ধকতা
পশ্চিমা দেশগুলো থেকে নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টের প্রযুক্তি ও জ্বালানি ক্রয় অনেক বেশি ব্যায়বহুল এবং এর সাথে রয়েছে কঠোর শর্তের বেড়াজাল। বর্তমান মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির কারণে রাশিয়া বা চীনের মতো তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও নমনীয় উৎস থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তি ও ইউরেনিয়াম সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়লে বাংলাদেশকে বিকল্প হিসেবে পশ্চিমা দেশগুলোর দিকে ঝুঁকতে হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও কানাডার মতো দেশ থেকে প্রযুক্তি ও জ্বালানি নেওয়া অনেকবেশী ব্যয়বহুল হবে এবং শর্তাবলি অনেক কঠোর ও জটিল।
প্রযুক্তি ও রিয়্যাক্টরের ব্যয় পশ্চিমা দেশগুলোতে রাশিয়ার তুলনায় ৪০% থেকে ৭০% বেশি। রূপপুরের মতো VVER-1200 প্রযুক্তির রিয়্যাক্টরের তুলনায় ফ্রান্সের EPR বা যুক্তরাষ্ট্রের AP1000 প্রযুক্তি অনেক ব্যয়বহুল। এছাড়াও ইউরেনিয়াম জ্বালানি সংগ্রহের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলো কঠোর নিরাপত্তা ও অ-প্রসারণ (Non-Proliferation) শর্ত আরোপ করে। এর মধ্যে রয়েছে:
- IAEA-এর অতিরিক্ত নজরদারি ও অডিট
- জ্বালানির ব্যবহার, সংরক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পশ্চিমা দেশগুলোর অনুমোদন
- কোনো অবস্থাতেই সামরিক ব্যবহারের সম্ভাবনা না থাকার নিশ্চয়তা
- দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে জ্বালানির মূল্য বাজারমূল্যের সাথে যুক্ত থাকা, যা জ্বালানি মূলের স্থিতিশীলতা নষ্ট ও অনিশ্চিয়তার মুখে ফেলে দিতে পারে।
পশ্চিমা দেশগুলো সাধারণত নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টরের পূর্ণাঙ্গ ফুয়েল সাইকেল (Fuel Cycle) দায়িত্ব নিতে অনিচ্ছুক। অর্থাৎ বাংলাদেশ শুধু রিয়্যাক্টর কিনতে পারবে, কিন্তু ব্যবহৃত জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ (Reprocessing) বা দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের দায়িত্ব তাদের উপর থাকবে না। ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হবে। এছাড়া, পশ্চিমা প্রযুক্তি গ্রহণ করলে বাংলাদেশকে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও স্থানীয়করণ-এর ক্ষেত্রেও অনেক বেশি ব্যয় করতে হবে, যা রাশিয়ার সাথে চুক্তির তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি বাংলাদেশকে বাধ্য হয়ে পশ্চিমা উৎসের দিকে যেতে হয়, তাহলে প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমাও দীর্ঘায়িত হবে। এ কারণে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির এই ধারাটিকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও পারমাণবিক খাতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে দিয়েছে। এখন সরকারকে কূটনৈতিকভাবে খুব সতর্কভাবে এগোতে হবে যাতে একদিকে মার্কিন বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখা যায়, অন্যদিকে পারমাণবিক জ্বালানি নিরাপত্তাও অটুট থাকে। বিষয়টি বর্তমানে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারক মহলে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।






