ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) জন্য পরিশোধিত পাম অলিন কেনায় বড় ধরনের
আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে সরকার। সরাসরি উৎপাদনকারী দেশ থেকে না কিনে
যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানির মাধ্যমে তেল কেনায় লিটারপ্রতি প্রায় ৯ টাকা বেশি
খরচ হচ্ছে। এতে ১ কোটি ৩০ লাখ লিটার তেল কেনায় রাষ্ট্রের গচ্চা যাচ্ছে প্রায় ১২
কোটি টাকা। গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে
অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে পাম অলিন কেনার
এই প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত পুনঃদরপত্রের মাধ্যমে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার হাউস জেনারেল ট্রেডিং এলএলসি’ থেকে ১ কোটি ৩০
লাখ ৩২ হাজার লিটার পাম অলিন কেনা হচ্ছে। এতে সরকারের মোট ব্যয় হবে ১৮১ কোটি ২৯
লাখ ৬ হাজার ৯৩২ টাকা।
যেভাবে বিপুল ক্ষতি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদিত প্রস্তাব
বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ওই কোম্পানি থেকে কেনা পাম অলিনের
প্রতি লিটারের দাম পড়ছে প্রায় ১৩৯ টাকা ১১ পয়সা। অথচ বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন,
সরাসরি পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হলে প্রতি
লিটারের দাম পড়ত ১৩০ থেকে ১৩২ টাকা। আর মালয়েশিয়া থেকে কিনলে দাম পড়ত ১৩৫
থেকে ১৩৭ টাকার মধ্যে।
ইন্দোনেশিয়ার বাজারদরের (১৩০ টাকা লিটার) সঙ্গে তুলনা করলে প্রতি লিটারে সরকারের
অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে ৯ টাকা ১১ পয়সা। ফলে পুরো চালানে মোট ক্ষতির পরিমাণ
দাঁড়াচ্ছে ১১ কোটি ৮৭ লাখ ২১ হাজার ৫২০ টাকা। অর্থাৎ, স্রেফ তৃতীয়
পক্ষের মাধ্যমে কেনায় সরকারকে প্রায় ১২ কোটি টাকা অতিরিক্ত বা
‘মধ্যস্বত্বভোগী ফি’ (মিডলম্যান ফি) হিসেবে গুনতে
হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি কেবলই ‘মধ্যস্বত্বভোগী’ যুক্তরাষ্ট্র কোনো পাম তেল
উৎপাদনকারী দেশ নয়। বাংলাদেশের আমদানিকারকেরা সাধারণত মালয়েশিয়া বা
ইন্দোনেশিয়া থেকেই এই তেল আমদানি করে থাকেন। সরবরাহকারী মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার
হাউস জেনারেল ট্রেডিং এলএলসি’ কোনো তেল উৎপাদক প্রতিষ্ঠান নয়; বরং এই চুক্তিতে তারা
কেবল মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে কাজ করছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো একটি গুঞ্জনে দাবি করা হচ্ছে, এই তেল
ইন্দোনেশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে এরপর বাংলাদেশে আসবে, যার
ফলে দ্বিগুণ পরিবহন খরচ যুক্ত হচ্ছে। তবে অনুসন্ধানে ও সরকারি নথিপত্র ঘেঁটে দেখা
গেছে, এই তথ্য সঠিক নয়। মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি ইন্দোনেশিয়া থেকেই ২
লিটারের পেট বোতলে এই তেল চট্টগ্রামের ও মোংলার সমুদ্রবন্দরে সরবরাহ
করবে। অর্থাৎ, তেল যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে আসবে না, তবে মাঝখানে মার্কিন কোম্পানির
কমিশন যুক্ত হওয়ায় জনগণের করের টাকার এই বিপুল অংশ বেরিয়ে যাচ্ছে।
বাণিজ্য চুক্তির ফাঁদে এই খেসারত? সরাসরি মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়া থেকে সাশ্রয়ী
মূল্যে তেল না কিনে কেন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হলো—এর পেছনে
একটি সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব রয়েছে বলে জানা গেছে।
বাড়তি সম্পূরক শুল্ক এড়াতে দীর্ঘ আলোচনার পর গত ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে
‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)’ সই করে সরকার। ওই চুক্তির আওতায়
বাংলাদেশ আগামী ৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য এবং
১৫ বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের এলএনজি আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং
এই চুক্তির বাধ্যবাধকতার অংশ হিসেবেই সরকার এখন সাশ্রয়ী উৎস বাদ দিয়ে বেশি দামে
যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির মাধ্যমে ভোজ্যতেল কিনছে। তবে নিম্নআয়ের মানুষের
জন্য ভর্তুকি মূল্যে পণ্য কিনতে গিয়ে এভাবে মধ্যস্বত্বভোগী পুষে রাষ্ট্রের কোটি
কোটি টাকা ক্ষতি করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদেরা।