জুলাইয়ের সরকারবিরোধী আন্দোলন সফল ও নির্বাচনের পর আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ভুলে গেছে জুলাই-সমর্থক রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের ত্যাগ মনে রাখেননি স্ব-স্ব এলাকার নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাও।
যদিও নির্বাচনের আগে নিহতদের পরিবার ও আহতদের প্রতি রাজনৈতিক নেতাদের দরদ দেখানোর হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। নির্বাচনের পর প্রথম ঈদে নিহতদের পরিবারগুলোতে ছিল না কোনো আনন্দ। উল্লেখযোগ্য কেউ খোঁজ নিতেও যাননি। নীরবে কেটেছে তাদের ঈদ। জুলাইয়ে আহতদেরও খোঁজ নেয়নি কেউ।
জুলাই ফাউন্ডেশনের সবাই ঘুমের ওষুধ খেয়েছে
জুলাই আন্দোলনের সময় এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন আলিফ আহম্মেদ সিয়াম। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘাতে যুক্ত হন। ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর বিজয় উদযাপন করতে গেলে।আলিফ আহম্মেদ সিয়াম আর ঘরে ফিরে আসেননি। সন্ধ্যার দিকে অজ্ঞাত গুলিতে নিহত হন তিনি।
ছেলের জন্য চোখের পানি ফেলে মা তানিয়া আক্তার বলেন, শেষবার আমাকে বলেছিল, মা যদি বেঁচে ফিরি বিজয়ীর বেশে ফিরব। সেই কথাগুলো এখনও কানে বাজে।
মায়ের চোখের পানি না শুকালেও দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যেই সিয়ামকে ভুলে গেছে সবাই। তানিয়া আক্তার বলেন, ইউনূস সরকার ও জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে গতবার আমাদের খোঁজখবর নিয়েছিল। কিন্তু এবারের ঈদে সবাই ভুলে গেছে। তারা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে আছে।
সিয়ামের মায়ের ক্ষোভ শুধু একজন নিহতকে ভুলে যাওয়া নিয়ে নয়। তার অভিযোগ, যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সন্তান জীবন দিয়েছিল, সেই বৈষম্যই এখন নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
তার ভাষায়, শুনেছি জুলাই ফাউন্ডেশনের শত শত কোটি টাকা রাখার জায়গা নেই। কিন্তু যারা আন্দোলন করছে তারাই কিছু পাচ্ছে। বৈষম্য দূরের বদলে বৈষম্য তৈরি করছে। বৈষম্য দূর করার জন্য আন্দোলন হয়েছিল। এখন সেই বৈষম্যই হচ্ছে। মাঝখান দিয়ে আমাদের সন্তান হারিয়েছি। আমরা মায়েরা সন্তানহারা হয়েছি। আর কিছু না। পরবর্তীতে যে ডাকবে একটা মানুষও নামবে না।
তানিয়া আক্তার বলেন, আমাদের মতো নিরীহ মায়ের সন্তানের জীবনের কোনো মূল্য নেই। আমরা শুধু সন্তানহারা হয়েছি, আর কিছু না। আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দিক ওরা।
আন্দোলন-ভাঙচুরের জন্য দরকার হয় আমাদেরকে: এলাকাবাসীর ঘৃণার পাত্র জুলাইযোদ্ধারা
কুমিল্লা জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন মো. রানা। অভাব-অনটনের সংসারে পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। স্নাতক তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় পরিবারের হাল ধরেন। জুলাই আন্দোলনে যোগ দিয়ে আহত হন। তবে জুলাইযোদ্ধা হিসেবে কোনো সুযোগ-সুবিধা পাননি বলে জানান তিনি।
রানা বলেন, আমাদের শুধু আন্দোলনের সময় দরকার ছিল। যাদের ডাকে রাস্তায় গিয়েছিলাম, ভাঙচুর করেছিলাম, তারা কেউ এখন আর খোঁজ নেয় না। সবাই নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছে। একেকজন কোটি কোটি টাকা বানিয়েছে। আর আমরা যারা সামনে ছিলাম, আমাদের কথা ভুলে গেছে সবাই।
জামালপুরের কামাল হোসেন রিকশার পার্টসের ছোট দোকান চালাতেন। চার সদস্যের পরিবার চলত সেই আয়ে। জুলাই আন্দোলনে যোগ দিয়ে ঢাকায় ছররা গুলি লাগে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর এখন গ্রামের বাড়িতে। স্ট্রোকের পর থেকে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। কিন্তু সেই টাকা জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
একই জেলার নাফিসা আলম দিয়া ঢাকার গ্রিন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, আমরা পরিবর্তনের আশায় রাস্তায় নেমেছিলাম। প্রকৃত জুলাইযোদ্ধারা ৫ই আগস্টের পর কোনো সুবিধা পাননি। যারা এখন জুলাইয়ের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন সুবিধা নিচ্ছেন, আন্দোলনের সময় তাদের কাউকে মাঠে দেখা যায়নি। আমরা বুঝতে পেরেছি, আমাদের ব্যবহার করা হয়েছে।
জামালপুরের আরেক জুলাইযোদ্ধা রাব্বি ইসলাম আন্দোলনে ভাঙচুর করে জেলে গেছেন। জেল থেকে বের হওয়ার পর তার খোঁজ নেয়নি কেউ।
তিনি বলেন, আমরা কোনো গাড়ি-বাড়ি বা সুবিধা চাই না। শুধু চাই দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা আসুক। সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক।
জামালপুর জেলা থেকে জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়ে সারা দেশে অন্তত ১১৭ জন আহত হয়েছেন। নিহত হয়েছেন ১৭ জন।
যাদের ডাকে জুলাই আন্দোলনে, খোঁজ নেয় না তারাও
৩৬ জুলাই ঐক্য পরিষদ জামালপুরের সিনিয়র সহসভাপতি হারুন অর রশীদ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আমরা যা পাচ্ছি তা যথেষ্ট নয়। অনেকে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। অনেকে কষ্টে আছেন। যাদের ডাকে আন্দোলনে গিয়েছি তারা নিহতের পরিবার, আহতদের খোঁজ নিচ্ছেন না। যেভাবে সম্মান পাওয়ার কথা ছিল, খবর নেওয়ার কথা ছিল, তা নিচ্ছে না। সঠিক মূল্যায়নও পাচ্ছে না। দুই বছর হয়ে গেছে, এখনই এমন অবস্থা। সামনে কী হতে পারে।
জামালপুরের ফজলে রাব্বী পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ ছিলেন। উচ্চ মাধ্যমিকের পর পড়াশোনা ছেড়ে সংসারের হাল ধরেন। জুলাই আন্দোলনে এক হাত ভেঙে যায়। এখন কোনো কাজ করতে পারেন না। এক বছর বয়সি সন্তান আছে। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফজলে রাব্বী বলেন, যারা সমন্বয়ক ছিল, তারা একটা নতুন দলে পদ-পদবি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা যারা জুলাই আহত, তাদের করুণ অবস্থা। যখন এলাকা দিয়ে চলাফেরা করি, অনেকে অনেক কথা বলেন। যারা জুলাইযোদ্ধা ছিল, তাদের এখন মানুষ অন্যভাবে দেখে।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সবাই এখন আমাদের দোষ দেয়। অনেকে টিটকারি মারে, বলে ভিক্ষা কইরা খা। তোদের জন্য দেশের আজকের এই অবস্থা, লোকে কর্ম করে খেতে পারে না। মাঝে মাঝে ভয় লাগে, লোকজন আমাদের পিটিয়ে মেরে ফেলে কি না, বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আমাদের খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই। আমার এক বছরের ছোট বাচ্চা আছে। এবারের ঈদে তাকে কিছু কিনে দিতে পারিনি। চিকিৎসায় যে খরচ হয়েছে, তার সামান্যও সহায়তা পাইনি। ডাক্তার ভারী কাজ করতে নিষেধ করেছেন। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
জামালপুরের সরিষাবাড়ির রবিউল ইসলাম পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। জুলাই আন্দোলনে গিয়ে নিহত হয়েছেন। তিন বছর বয়সি মেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে থাকেন স্ত্রী লাবনী আক্তার।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে লাবনী বলেন, ঈদ সবার জীবনে আনন্দ নিয়ে এলেও আমাদের জীবনে তা কষ্টের স্মৃতি হয়ে আসে। আমার সন্তান বাবাকে খোঁজে, আমি তাকে কীভাবে বোঝাই, সে সারা জীবন বাবাকে ছাড়া বড় হবে। আমার স্বামী কোনো অপরাধ করেনি। সে আন্দোলন চেয়েছিল। সেই স্বপ্ন নিয়ে সে বের হয়েছিল।
বরিশালের আবদুল্লাহ আল আবির নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাপোর্ট স্টাফ ছিলেন। জুলাই আন্দোলনে যোগ দেন তিনি। ১৯শে জুলাই পুলিশের গুলিবিদ্ধ হন। ২০শে জুলাই হাসপাতালে মারা যান।
ছেলের ১১ নম্বর জার্সি বুকে জড়িয়ে ধরে এখনও কান্না করেন মা পারভীন সুলতানা। ১৮ই জুলাই ছেলে যে বিস্কুট আর সাবান কিনে দিয়েছিল, তা এখনও রেখে দিয়েছেন। ঈদে ছেলের পছন্দের ফিরনিও রান্না করেননি। আবিরকে হারিয়ে পুরো পরিবার দিশাহারা। বাবা মিজানুর রহমান বাচ্চুর সামান্য আয়ে কোনোমতে সংসার চলছে।
বরিশাল নগরের শাহিন হোসেন রকি পুলিশের লাঠিচার্জে হাতে আঘাত লাগায় ভারী কাজ করতে পারেন না। অর্থাভাবে চিকিৎসাও হয়নি ঠিকমতো। জীবিকার টানাপোড়েন আর চিকিৎসা নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছেই না তার।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র (বৈছা) আন্দোলনের বরিশাল জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক সাব্বির হোসেন সোহাগ বলেন, যারা এমপি হয়েছেন, নিহতের পরিবারের পাশে তাদের সবার দাঁড়ানো উচিত। ওদের রক্তের বিনিময়ে তারা আজ সংসদে গিয়েছেন।
আন্দোলনের সময় ১৯শে জুলাই ঢাকায় রামপুরা টিভি সেন্টার ভাঙচুর আর আগুন দিতে গিয়ে পুলিশের ছোড়া ছররা গুলিতে আহত হন ফেনীর ছাগলনাইয়ার হুমায়ুন ফরিদ হৃদয়। এখনও তার শরীরে আছে ৩৬টি স্প্লিন্টার। বি ক্যাটাগরির জুলাইযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হৃদয়। চিকিৎসকরা জানান, মাথায় আটকে থাকা স্প্লিন্টারের কারণে যে কোনো সময় তার স্মৃতিশক্তি চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।
হৃদয় বলেন, দুবাই থেকে দেশে এসে আন্দোলনে যোগ দিই। এখন কোনো কাজ করতে পারি না। চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছি। নিজের একটা থাকার ঘরও নেই, বৃষ্টি এলে আতঙ্কে থাকতে হয়। পরিবারের কাছে এখন বোঝা হয়ে গেছি। এলাকার লোকজন ঘৃণা করে আমাদেরকে।
কুমিল্লার গলিয়ারা দক্ষিণ ইউনিয়নের বাড়াইপুর গ্রামের আবুবকর ছিদ্দিক বলেন, আমরা কোনো কিছুর আশায় আন্দোলনে নামিনি। আমি কিছু না পেলেও স্বৈরাচার দূর করতে পেরেছি, এটাই বড় পাওয়া। তবে আমাকে না দিলেও আমার মতো প্রকৃত যোদ্ধাদের যদি মূল্যায়ন করা হতো, তাতেই খুশি হতাম।
বৈছা আন্দোলন কুমিল্লা মহানগরীর সাবেক সদস্যসচিব মুহাম্মদ রাশেদুল হাসান বলেন, ঈদে কেউ খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। আমি অসুস্থ। সুস্থ থাকলে চেষ্টা করতাম সবার খোঁজ নেওয়ার।
জনপ্রতিনিধিদের প্রতি সরাসরি অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, যারা জুলাইযোদ্ধা থেকে এমপি হয়েছেন, তাদের প্রথম দায়িত্ব ছিল জুলাইযোদ্ধাদের খোঁজখবর নেওয়া। তাদের কাছ থেকেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।






