স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক
দেশের পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারীদের আস্থার জায়গা হয়ে উঠতে পারছে না। গত এক সপ্তাহে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে প্রায় ৩ হাজার ৩১ কোটি টাকার বাজার মূলধন হারিয়ে গেছে। অথচ এ নিয়ে কোনো আলোচনা নেই কোথাও। না সংসদে, না রাজনৈতিক অঙ্গনে। বিনিয়োগকারীরা যেন অথৈ সমুদ্রে পড়েছেন। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকেই শেয়ারবাজার ধারাবাহিকভাবে মূলধন হারাচ্ছে। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, শেষ সপ্তাহে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আরও ৪ হাজার কোটি টাকা উধাও হয়। সর্বশেষ সপ্তাহে আবারও ৩ হাজার ৩১ কোটি টাকা হারিয়ে মোট এক মাসে বাজার থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি মূলধন কমে গেছে।
বিশেষ করে বড় মূলধনি কোম্পানিগুলোর শেয়ার বিক্রির চাপই এই পতনের প্রধান কারণ। যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা হলেও দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক কোনো সংকেত না পাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসেনি, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সূচক ও বাজার মূলধনে। গত সপ্তাহের শুরুতে ডিএসইর মোট বাজার মূলধন ছিল ৬ লাখ ৮৮ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা, যা সপ্তাহ শেষে নেমে আসে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৬৩১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ কার্যদিবসেই ৩ হাজার ৩১ কোটি টাকার মূলধন হারিয়েছে বাজার। সূচকের ক্ষেত্রেও মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৫৭ পয়েন্টে। বড় কোম্পানিগুলোর সূচক ডিএস-৩০ ১২ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৯৯০ পয়েন্টে নেমে এসেছে। তবে শরিয়াহভিত্তিক সূচক ডিএসইএস ৩ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৬৬ পয়েন্টে পৌঁছেছে।
যদিও সূচক ও মূলধনে পতন ঘটেছে, লেনদেনের গতি ছিল উল্টো ঊর্ধ্বমুখী। ডিএসইতে দৈনিক গড় লেনদেন ২২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ৮১৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের সপ্তাহে ছিল ৬৭০ কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারের দাম কমে যাওয়ায় কিছু বিনিয়োগকারী নতুন করে বাজারে প্রবেশ করছেন, যদিও অনেকেই এখনো অপেক্ষার অবস্থানে রয়েছেন।
সূচকের পতনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে বড় পাঁচটি কোম্পানি—ইসলামী ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ, ব্র্যাক ব্যাংক ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস।
খাতভিত্তিক লেনদেনে প্রকৌশল খাত ১৭ দশমিক ২ শতাংশ অংশ নিয়ে শীর্ষে ছিল। এরপর ছিল ওষুধ ও রসায়ন এবং সাধারণ বীমা খাত। তবে রিটার্নের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ১ দশমিক ৪ শতাংশ লোকসান হয়েছে ব্যাংক খাতে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ থেকে বিরত রাখছে। সপ্তাহের শুরুতে লভ্যাংশের আশায় কিছুটা ইতিবাচকতা দেখা গেলেও পরবর্তীতে নতুন করে বিক্রির চাপ তৈরি হয়, ফলে বাজার পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়নি।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১১ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ৭৬২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। সেখানে সাপ্তাহিক লেনদেন হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ৯৩ কোটি টাকা কম।
বর্তমানে শেয়ারবাজারে এক ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে—লেনদেন বাড়লেও মূলধন কমে যাওয়া এবং বড় কোম্পানিগুলোর দরপতন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি ‘স্থিতিশীল হলেও নাজুক’। একদিকে লেনদেন বৃদ্ধিতে তারল্যের ইঙ্গিত মিলছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ধাক্কা দিচ্ছে। আগামী সময়ে কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপরই বাজারের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে।






