স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক
মাত্র ৪ হাজার টাকার একটি ব্যাগের দাম দেখানো হয়েছে ৩৪ হাজার ৪০০ টাকা। দামি ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করা হলেও সরবরাহ করা হয়েছে নিম্নমানের পণ্য, এমনকি লোগোও আলাদাভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে। একইভাবে, ৩ হাজার টাকার একটি কার্ড রিডারের জন্য নেওয়া হয়েছে ২১ হাজার ৫০০ টাকা। ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকার একটি ডিজিটাল এসএলআর ক্যামেরা বডির মূল্য ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯ হাজার ৫০০ টাকা। এভাবে চারটি ক্যামেরা বডির জন্য ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকা।
সব মিলিয়ে ছবি তোলার সরঞ্জাম কেনায় সরকারের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৫৮ লাখ ৪৪ হাজার ১৩০ টাকা, যেখানে প্রকৃত বাজারমূল্য ২০ লাখ টাকারও কম। অবিশ্বাস্য হলেও এমন অনিয়ম ঘটেছে জাতীয় সংসদে—যেখানে প্রতিনিয়ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া হয়। সংসদের অধিবেশনের ছবি ধারণের জন্য অস্বাভাবিক দ্রুততায় এই কেনাকাটা সম্পন্ন করা হয়েছে। ৩০ দিনের মধ্যে সরবরাহের কথা থাকলেও মাত্র ১৯ দিনেই তড়িঘড়ি করে সব পণ্য সরবরাহ করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করেছেন সদ্য বিদায় নেওয়া সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মাওলা। কাগজে-কলমে নিয়ম মেনে হলেও বাস্তবে ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে এ কেনাকাটা সম্পন্ন হয়েছে।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর এটিই ছিল সংসদ সচিবালয়ের প্রথম কেনাকাটা। ১২ই মার্চ সংসদের কার্যক্রম শুরু হয়, ২৫শে মার্চ ক্রয়াদেশ দেওয়া হয় এবং ১৫ই এপ্রিলের মধ্যে সরবরাহ শেষ করা হয়। মোট ১২ ধরনের ক্যামেরা-সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। চারটি ক্যামেরা বডির পাশাপাশি চার ধরনের লেন্স কেনা হয়। ২৪-৭০ মিমি ফোকাল লেন্থের তিনটি লেন্স কেনা হয়েছে ৩৭ লাখ ৪১ হাজার টাকায়, প্রতিটির দাম ১ লাখ ২৪ হাজার ৭০০ টাকা—যেখানে বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা।
এছাড়া ২৪-১২০ মিমি লেন্স কেনা হয়েছে ২ লাখ ১০ হাজার ৭০০ টাকায় (বাজারমূল্য ১ লাখ ৫-১০ হাজার টাকা), ১৪-২৪ মিমি লেন্স ৪ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকায় (বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা) এবং ১০০-৪০০ মিমি লেন্স ৫ লাখ ৭৬ হাজার ২০০ টাকায় (বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা)।
স্পিডলাইট (ফ্ল্যাশ) ছয়টি কেনা হয়েছে ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৩০০ টাকায়—প্রতিটির দাম ১ লাখ ১ হাজার ৫০ টাকা, যেখানে বাজারমূল্য মাত্র ১০-১৫ হাজার টাকা। এছাড়া ১২৮ জিবির ১০টি মেমোরি কার্ড কেনা হয়েছে ৩ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকায় এবং আরও ১০টি এসডি কার্ড কেনা হয়েছে ৮১ হাজার ৭০০ টাকায়।
কার্ড রিডার, ব্যাটারি ও অন্যান্য সরঞ্জামও একইভাবে অতিমূল্যে কেনা হয়েছে। টেন্ডারে জাপানি ব্র্যান্ডের পণ্য সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে দেওয়া হয়েছে ভিন্ন কোম্পানির পণ্য।
সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্টদের দাবি, অধিকাংশ পণ্যই নিম্নমানের এবং অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন কোম্পানির যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু পণ্য স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও সন্দেহ রয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত হলে বড় ধরনের অনিয়মের চিত্র সামনে আসতে পারে।
এই সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে সেফ ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যার মালিক সঞ্জয় কুমার দাস। প্রতিষ্ঠানটির কোনো ওয়েবসাইট নেই, শুধু একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, দাম বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে ভ্যাট-ট্যাক্স এবং ব্র্যান্ডেড পণ্যের কথা। তবে বাজারদরের সঙ্গে বিশাল ব্যবধানের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কথা না বাড়িয়ে ফোন কেটে দেন।
এ বিষয়ে স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তা জানান, একটি কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কেনাকাটা হয়েছে এবং তিনি নতুন হওয়ায় আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, আগের সচিব নিজেই পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং সব কিছু নিয়মের ভেতরে রেখে দ্রুত কাজ শেষ করেছেন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো জবাবদিহি এড়ানো যায়।
অভিজ্ঞ এক ফটোগ্রাফার বলেন, সংসদের মতো জায়গায় ভালো ছবি তুলতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার সরঞ্জামই যথেষ্ট। সেখানে ৫৮ লাখ টাকার কেনাকাটা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক। অন্য ফটোগ্রাফাররাও এ ব্যয়কে অযৌক্তিক ও বিস্ময়কর বলে মন্তব্য করেছেন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবেক সচিব কানিজ মাওলার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।







