যুদ্ধবিরতির পর পাকিস্তানি জাহাজ ছাড় পেলেও হরমুজ প্রণালি পেরোতে পারেনি বাংলাদেশি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার জাহাজ। আটকে দিয়েছে ইরান কর্তৃপক্ষ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ‘অতি মাখামাখি’ এর প্রধান কারণ বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা গেছে, প্রথাম দফা বাধা পেয়ে যাত্রা স্থগিত করেছিল বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের জাহাজ বাংলার জয়যাত্রা। যুদ্ধবিরতির খবর শুনে দ্বিতীয় দফা যাত্রার উদ্যোগ নিলে ইরানি বাহিনীর নির্দেশে প্রণালিতে প্রবেশের পর জয়যাত্রার অগ্রযাত্রা পুনরায় থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০২৪-এ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অতি ‘মাখামাখি’র ফল ভুগতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিটি খাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কালো ছায়া যেমন পড়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও পড়েছে এর প্রভাব। যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে ইরানকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে, সেই মার্কিনিদের সাথে বাংলাদেশের নন ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট, আমদানি-রপ্তানির গতি-প্রকৃতির পরিবর্তন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি-কূটনীতি এমনকি সামরিক খাতে মার্কিনিদের প্রভাব, রাশিয়া থেকে তেল কিনতে মার্কিনিদের অনুমতিসহ বিভিন্ন বিষয় নজর এড়ায়নি ইরানের। গতকাল ১৭ই এপ্রিল, শুক্রবার বিকেলে ইরান হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা দিলে রাত ৯টার দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ বন্দরের কাছ থেকে নোঙর তুলে ফুজাইরার উদ্দেশে রওনা দেয় জাহাজটি। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা থামিয়ে দেওয়া হয়।
জানা যায়, অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজের মতোই ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অনুমতি ছাড়াই প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করে বাংলার জয়যাত্রা। রাত ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে জাহাজটি হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করে। কিন্তু রাত সাড়ে ১২টার দিকে ইরানি নৌবাহিনী রেডিও বার্তার মাধ্যমে সব জাহাজকে ইঞ্জিন বন্ধ করার নির্দেশ দেয় এবং জানায়, আইআরজিসির অনুমতি ছাড়া কেউ প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে না। তবে এর আগেই পাকিস্তানি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পেরোনোর সংবাদ জানা গেছে। গত ১৬-১৭ই এপ্রিল পাকিস্তানি পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ শালামার আরব আমিরাতের ক্রুড অয়েল নিয়ে নির্বিঘ্নে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে নিজ দেশে রওনা হয়েছে। পাকিস্তানি জাহাজ ছাড় পেলেও ছাড় পায়নি বাংলাদেশি জাহাজ, বিষয়টি কূটনৈতিক মহলে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি ইরানের প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশচুম্বি। ইরানে হামলা প্রসঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানও ছিল প্রত্যাশিত। বিশ্বের অমুসলিম অনেক রাষ্ট্র ইরানের পক্ষাবলম্বন করলেও বাংলাদেশ কূটনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট না করে পরোক্ষভাবে মার্কিন নীতি অনুসরণ করেছে। এ নিয়ে সরাসরি অসন্তোষ জানান ঢাকাস্থ ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি। গত ১লা এপ্রিল ইরান দূতাবাসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতিতে আমরা কষ্ট পেয়েছি। এই বিবৃতি আরও স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল। বাংলাদেশ আমাদের ভাই হিসেবে ইরানে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে নিন্দা করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু সেটা হয়নি। এটি আমাদের জন্য কষ্টের বিষয়।’ রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও ওআইসির সদস্য রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। রাশিয়া ও চীন মুসলিম দেশ না হয়েও তারা এই আগ্রাসনের ব্যাপারে নিন্দা জানিয়েছে। সেখানে একটি মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও জোরালো হওয়া উচিত ছিল। কূটনীতিবিদরা এ ঘটনাকে এখন অব্দি ইরানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বলে মনে না করলেও বাণিজ্যিক সম্পর্কে একটা বড় ধাক্কা হিসেবে মনে করছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক। অনুমতি চাওয়ার পর তা প্রত্যাখ্যান করে কোনো বার্তা না দেওয়ায় আমরা মনে করেছিলাম প্রণালিটি উন্মুক্ত করা হয়েছে। এ সময় প্রায় ৪০টার মত বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। জয়যাত্রাও তাদের পথ অনুসরণ করে এগোতে থাকে। তিনি আরও জানান, রাত ১১:৫০ টার দিকে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করে জয়যাত্রা। যে গতিতে চলছিল, ভোর ৩টার দিকে হরমুজ অতিক্রম করে ওমান সাগরে প্রবেশ করা যেত। তবে হঠাৎ সাড়ে ১২টার দিকে রেডিও বার্তা পাঠিয়ে সব জহাজের গতিরোধ করার আদেশ দেয় ইরানিয়ান নেভি এবং আইআরজিসির অনুমতি ছাড়া হরমুজ পার হওয়া যাবে না বলে হুঁশিয়ার করে।
এর আগে ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনার কারণে ৩১ জন নাবিকসহ প্রায় ৪০ দিন আটকে ছিল বাংলার জয়যাত্রা। গত ৮ই এপ্রিল যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করলেও ১০ই এপ্রিল প্রথমবার হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি পায়নি জাহাজটি। পরে শারজাহ বন্দরে ফিরে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় ছিল।