আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লক্ষ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ রাজস্ব সংগ্রহের এই টার্গেট পূরণে ভ্যাট ও আয়করে কোনো ছাড় না দেওয়া, কর অব্যাহতি কমানো এবং করের আওতা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, খুচরা ব্যবসী এবং ফুটপাতের অস্থায়ী হকারদের উপর কর ও নিয়ন্ত্রণের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় বলেছেন, সামনে রাজস্ব আদায়ের কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ এবং আইএমএফের শর্ত পূরণে এনবিআর কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ভ্যাট নিবন্ধনের সীমা কমিয়ে আনা, লেনদেনের কর সীমা হ্রাস এবং নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা চলছে।
এর ফলে বিস্কুট, মোবাইল রিচার্জ, ইন্টারনেট বিল, তৈরি পোশাক, সেলাইয়ের দোকান, ছোট রেস্তোরাঁসহ অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসা এখন ভ্যাটের আওতায় আসছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে তাদের ব্যবসায়িক খরচ বৃদ্ধি পাবে, মুনাফা কমবে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার উপর দাম বৃদ্ধির বোঝা চাপবে। ব্যবসায়ী মহলের অপারগতা সত্ত্বেও এনবিআর কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। একই সঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ফুটপাতে অস্থায়ী ব্যবসা করতে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দিয়েছে। ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ফুটপাতে ব্যবসা করতে লাইসেন্স নিতে হবে। রাস্তায় যত্রতত্র ব্যবসা করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা যাবে না। এলাকাভিত্তিক হকারদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তালিকা সম্পন্ন হলে নির্দিষ্ট এলাকা, নির্দিষ্ট সময় ও সংখ্যায় অনুমতি দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, “আমরা হকার ও রিকশাওয়ালাদের প্রতি অমানবিক হতে চাই না। উচ্ছেদ নয়, পুনর্বাসন করতে চাই।” তবে লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা করা যাবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢামেক হাসপাতালসংলগ্ন ফুটপাত দখলমুক্ত করে সৌন্দর্যবর্ধনের পাইলট প্রকল্প শুরু করা হয়েছে। সফল হলে অন্যান্য এলাকায়ও একইভাবে ফুটপাত দখলমুক্ত ও নান্দনিক করা হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজস্বের চাপে সরকার ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খাতকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনছে। ভ্যাটের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে অসংগঠিত ব্যবসাকে সরকারি তত্ত্বাবধানে আনা হচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলো আশঙ্কা করছে, এতে তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে এবং অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবেন।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না করলে উন্নয়ন প্রকল্প, ঋণ পরিশোধ ও জনকল্যাণমূলক কাজ ব্যাহত হবে। তাই করের আওতা বাড়ানো এবং শহরের ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।
কিন্তু ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য যৌক্তিক করমুক্ত সীমা বজায় রাখা এবং অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া উচিত।আসন্ন বাজেটে এনবিআর কীভাবে এই লক্ষ্য পূরণ করে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সুরক্ষায় কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেয়—তা নিয়ে সকল মহলে তীব্র আলোচনা চলছে। বর্তমানে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ স্পষ্টভাবে বেড়ে চলেছে।






