ইতিহাসের পাতায় এটি স্থান করে নেওয়ার মতো এক মুহূর্ত। নাসার আর্টেমিস-২ মিশন গতকাল চাঁদের প্রত্যাশিত ফ্লাইবাই সম্পন্ন করেছে। ওরিয়ন ক্যাপসুলে করে চার নভোচারী চাঁদের মাত্র ৪,০৬৭ মাইলের মধ্যে চলে এসেছিলেন।
চাঁদের অন্ধকার দিকের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় তারা পৃথিবী থেকে প্রায় ২,৫২,৭৫৬ মাইল দূরে ছিলেন। এটি অ্যাপোলো-১৩-এর রেকর্ড ভেঙে মানুষের সবচেয়ে দূরের মহাকাশযাত্রার নতুন রেকর্ড গড়েছে।
সাত ঘণ্টাব্যাপী এই ফ্লাইবাইয়ের সময় নভোচারীরা চাঁদের এমন সব দৃশ্য দেখেছেন। যা আগে কোনো মানুষের চোখে পড়েনি। তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে চাঁদের রহস্যময় অন্ধকার দিকের প্রায় ২১ শতাংশ সূর্যের আলোয় আলোকিত ছিল।
প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে দুই শিফটে কাজ করে নাসার নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন প্রায় ১০ হাজার ছবি তুলেছেন।
চাঁদের পেছনে যাওয়ার সময় প্রায় ৪০ মিনিট যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। এ সময় তাঁরা ‘আর্থসেট’ দেখেছেন, পৃথিবী চাঁদের পেছনে ডুবে যাচ্ছে। যেটি ১৯৬৮ সালে অ্যাপোলো নভোচারীরা দেখেছিলেন।
ছবিতে চাঁদের পৃষ্ঠে অসংখ্য গর্ত স্পষ্ট। পৃথিবীর আলোকিত অংশে অস্ট্রেলিয়া ও ওশেনিয়ার ওপর মেঘের আস্তরণ দেখা গেছে, আর অন্ধকার অংশ রাতের আঁধারে ঢাকা।
আর্টেমিস বিজ্ঞান দল নভোচারীদের চাঁদের নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য দেখার প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, প্রাচীন লাভা প্রবাহ ও উল্কাপাতের গর্ত। আর্থসেটের এক ছবিতে তাঁরা হার্টজস্প্রুং বেসিন দেখেছেন, যা দুটি কেন্দ্রীয় বলয়ের মতো দেখাচ্ছে।
তারা ওরিয়েন্টাল বেসিনের বলয়ও দেখেছেন, যা চাঁদের সবচেয়ে নবীন বড় উল্কাপাতের গর্তগুলোর একটি। এর আগে কোনো মানুষ চোখে এটি দেখেনি।
ওরিয়েন্টালের ১০টার অবস্থানে দুটি ছোট গর্ত। নভোচারীরা একটির নাম প্রস্তাব করেছেন ‘ইনটেগ্রিটি’, তাদের ওরিয়ন মহাকাশযানের নামে। অন্যটির নাম ‘ক্যারল’, কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যানের স্ত্রী ক্যারল টেলর ওয়াইজম্যানের স্মরণে। নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটের নার্স ক্যারল ২০২০ সালে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে মারা যান।
‘ক্যারল’ নামকরণের পর চার নভোচারী একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন। হিউস্টনের নাসা মিশন কন্ট্রোলে নীরবতা পালন করা হয়।
ফ্লাইবাইয়ের পরবর্তী পর্যায়ে নভোচারীরা এক অসাধারণ সৌরগ্রহণ দেখেছেন। ওরিয়নের জানালা দিয়ে চাঁদকে পৃথিবী থেকে অনেক বড় দেখাচ্ছিল। চাঁদ সূর্যকে আড়াল করার সময় সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল ‘করোনা’ দৃশ্যমান হয়। নভোচারীরা এর ‘স্ট্রিমার’ বা ‘শিশুর চুল’-এর মতো গঠনগুলো দেখেছেন।
মহাকাশ থেকে গ্রহণের ‘টোটালিটি’ বা পূর্ণ আড়াল প্রায় এক ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছে। যেখানে পৃথিবীতে এটি সাধারণত মাত্র কয়েক মিনিটের হয়। গ্রহণের সময় তারা মঙ্গল, শুক্র ও শনি গ্রহসহ তাঁরা এবং ‘আর্থশাইন’ দেখেছেন।
ফ্লাইবাই শেষে আর্টেমিস-২-এর কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান নাসা বিজ্ঞান দলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা আমাদের জন্য এমন উত্তেজনাপূর্ণ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি তৈরি করেছেন। কিছু সত্যিকারের মানবিক মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন। আমরা ভালোভাবে প্রস্তুত ছিলাম। এটাই আমাদের সেরা কাজ।’
তোলা ছবিগুলো চাঁদ ও তার উৎপত্তি সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা সমৃদ্ধ করবে এবং ভবিষ্যৎ চন্দ্র অভিযানের ভিত্তি তৈরি করবে।
কানাডিয়ান নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন নাসা প্রশাসক জারেড আইজ্যাকম্যানের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘পৃথিবীকে মহাকাশ থেকে দেখলে যেমন ভিন্ন লাগে। চাঁদের অন্ধকার দিক থেকে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল আমরা আর ক্যাপসুলে নেই। যেন চাঁদের অপর প্রান্তে সরাসরি চলে এসেছি। এটি মনকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এক অসাধারণ মানবিক অভিজ্ঞতা। আমরা কৃতজ্ঞ।’






