এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নাগরিকরা সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, টিকা কেনার ক্ষেত্রে সরকারের অদূরদর্শিতা আজ সাধারণ মানুষকে মূল্য দিতে বাধ্য করেছে।
জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, গত সাড়ে পাঁচ বছরে হাম-রুবেলার টিকাদান ক্যাম্পেইন না হওয়ায় এবং টিকার মজুদে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে শিশুরা প্রাণঝুঁকিতে পড়েছে।
জানা যায়, ১৯৯৮ সালে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সরকার দাতা সংস্থার সহায়তায় স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) চালু করে। এই কর্মসূচি শিশু ও মাতৃ স্বাস্থ্য, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, টিকাদানসহ স্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনা করত। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। তারা সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ করে নিজস্ব অর্থায়নে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে ২০২৫ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে সেক্টর প্রোগ্রাম বাতিল করা হয়। সেক্টর প্রোগ্রাম হচ্ছে সরকার ও বিদেশি সংস্থার যৌথ সহায়তায় পরিচালিত একটি টিকা কর্মসূচি।
সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম ও বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সাইদুর রহমানকে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি। তবে সম্প্রতি ডয়চে ভেলেকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় অধ্যাপক সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমরা পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সেক্টর কর্মসূচি বাতিল করেছি। তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, আর অনুদানভিত্তিক টিকা নেওয়া হবে না, নিজস্ব অর্থায়নে টিকা কেনা হবে। হামের টিকা শিশুর প্রথম ডোজ ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে আক্রান্ত বা মারা যাওয়া শিশুর অধিকাংশ ৯ মাসের কম বয়সী। তাই টিকার দায় চাপানো যৌক্তিক নয়।’
বর্তমান সংকটের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সিদ্ধান্তকে দায়ী করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা ক্রয়ের সিস্টেমে একটা পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। উদ্যোগটি ভালো, কিন্তু সেটি গ্রহণ করা হয়েছে প্রয়োজনীয় পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই। তাদের এমন অদূরদর্শী পদক্ষেপের ফলে টিকা কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে এবং দেশের স্বাস্থ্য খাতে অবধারিতভাবে সেটির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
তিনি আরো বলেন, দেশে হামের মহামারি চলছে। মহামারি বললে সরকার ভয় পায়। অন্তর্বর্তী সরকারও একই কাজ করেছে। মহামারির সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো রোগের বিস্তার যদি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়, এবং দেশের স্বাস্থ্য এটা সামাল দিতে না পারে, তখন এটাকেই মহামারি বলা হয়। সরকার রোগটির বিস্তারের তথ্য আগে জানলেও প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘প্রতিবছর আমাদের দেশে কমবেশি ৩০ লাখ শিশু জন্মগ্রহণ করে। জন্মের পরে-আগে এদের প্রায় ৯৮ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা হতো। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনার যে গাফিলতিটি হয় সেই গাফিলতির কারণে ওই সময়কালে জন্ম নেওয়া শিশুরা আজ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে। অর্থাৎ এটি হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ করে যিনি নির্বাহী স্বাস্থ্য উপদেষ্টা তাঁর অদূরদর্শিতা, অবহেলা অথবা অক্ষমতা।’ তিনি আরো বলেন, পুরো বিষয়টির একটা নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার এবং কেন এটি ঘটল সেই দায়ী ব্যক্তি অথবা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা দরকার।
৮ ধরনের টিকার বড় ঘাটতি :
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশে এমআর টিকার সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। ৬৪ জেলায় এ সময় মোট চাহিদা ছিল ছয় লাখ ৪৬ হাজার ৪১০ ভায়াল (প্রতি ভায়ালে পাঁচ ডোজ)। এর বিপরীতে সরবরাহ করা গেছে মাত্র এক লাখ ৭৭ হাজার ৪৫০ ভায়াল। এতে চাহিদার মাত্র ২৭.৪৫ শতাংশ পূরণ হয়েছে। অর্থাৎ ৭২.৫৫ শতাংশ টিকার চাহিদা অপূর্ণ থেকে গেছে, যা মাঠ পর্যায়ের টিকাদান কার্যক্রমে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।
একই সঙ্গে ইপিআইয়ের মাধ্যমে দেওয়া অন্যান্য টিকার মধ্যে পেন্টাভ্যালেন্ট, বাইভ্যালেন্ট ওরাল পোলিও (পওপিভি), বিসিজি, ইন-অ্যাকটিভেটেড পোলিও (আইপিভি), নিউমোকক্কাল কনজুগেট (পিসিভি) এবং টিটেনাস-ডিপথেরিয়া (টিডি) টিকার এই সময় চাহিদা ছিল ৫১ লাখ ৩৪ হাজার ৭৩ ভায়াল। সরবরাহ করা হয়েছে ২৫ লাখ ২৯ হাজার ৭৪০ ভায়ালের কিছু বেশি।
ইপিআইয়ের পরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, বাজেট ও ক্রয় পদ্ধতির পরিবর্তনই সংকটের মূল কারণ। ১৯৭৯ সাল থেকে চালু পদ্ধতি পরিবর্তন করে টিকা কেনা এখন উন্নয়ন বাজেটের পরিবর্তে রাজস্ব খাতে নেওয়া হয়েছে। ফলে অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হয়েছে।
সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধে স্বাস্থ্যসেবা স্থবির :
দেশে সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ থাকায় ৩৪টির বেশি উন্নয়ন কর্মসূচি স্থবির অবস্থায় পড়েছে। এতে প্রাথমিক স্বাস্থ্য, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, বিকল্প চিকিৎসা ইত্যাদি খাতে সেবা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই সিদ্ধান্তে আগে নির্মূল হওয়া রোগগুলো আবার ছড়িয়ে পড়বে এবং বিগত বছরের স্বাস্থ্য বিনিয়োগ কার্যহীন হবে। দেশের ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকও ওষুধ, বেতন ও সেবা বন্ধের কারণে সংকটে পড়েছে। ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, হেপাটাইটিস, ডেঙ্গু, এইডস, জলাতঙ্ক, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বন্ধ রয়েছে।
অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, সেক্টর প্রোগ্রাম (স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি) কর্মসূচির অধীনে অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) ধারাবাহিকতা ছাড়া স্বাস্থ্য উন্নয়ন কর্মসূচি ব্যাহত হচ্ছে। ইপিআই টিকার মাধ্যমে আগে যে শিশুমৃত্যু কমানো সম্ভব হয়েছিল, তা পুনরায় বেড়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, দুর্বলতা চিহ্নিত করে বরাদ্দ বাড়িয়ে স্বাস্থ্য কর্মসূচি অব্যাহত রাখা জরুরি।
সেক্টর প্রোগ্রামের প্রধান কার্যক্রমে রয়েছে—প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, কমিউনিটি হেলথ, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান (ইপিআই), হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য সচেতনতা। সরকারি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজে যন্ত্রাংশ, ওষুধ, রিঅ্যাজেন্ট, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সরঞ্জামও ওপির ওপর নির্ভরশীল।
অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘স্বাস্থ্য উন্নয়ন কর্মসূচিতে স্বাভাবিক বরাদ্দ না থাকায় এমন কিছু সমস্যা তৈরি হচ্ছে, যা আমরা খালি চোখে দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু এ সমস্যা যখন প্রকাশিত হতে শুরু করবে তখন শুধু আপসোস করতে হবে। হারিয়ে যাওয়া মূল্যবান জীবনগুলো আর ফিরে পাব না।’
তিনি বলেন, ‘আগে প্রতিবছর পাঁচ লাখ শিশু মারা যেত, এর মধ্যে দেড় লাখ শিশু টিকার আওতায় যেসব রোগ আছে সেসব রোগে মারা যেত। একটা সময় পোলিও থেকে শিশু বিকলাঙ্গ হয়ে যেত। অনেক শিশু ও মা ধনুষ্টংকারে মারা যেত। ইপিআই কর্মসূচির টিকার দ্বারা এসব মৃত্যু অনেক কমে এসেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, জলাতঙ্ক—এসব রোগের কোনোটি নির্মূল হয়েছে, কোনোটি নির্মূলের পথে। আমরা কালাজ্বর নির্মূল কর্মসূচি শুরু করেছিলাম ২০০৫ সালে। ২০ বছর লেগেছে নির্মূল হতে। এসব সম্ভব হয়েছে ওপির ধারাবাহিকতার কারণে। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আমাদের ওপির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা উচিত। এখানে কিছু অপচয়, অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনায় সমস্যা থাকতে পারে। এ দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি বরাদ্দ বাড়িয়ে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো অব্যাহত রাখা উচিত।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম সেক্টর প্রোগ্রাম বাতিল করেছেন কোনো ধরনের স্টাডি ছাড়া। ফলে তখনকার বিদ্যমান পরিস্থিতি কী ছিল, টিকা না সরবরাহ হলে কী প্রভাব পড়তে পারে, উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে কী করতে হবে, রাজস্ব খাত থেকে বরাদ্দ নিতে হলে তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কী করতে হবে—এসব বিষয় পর্যালোচনা না করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলই হলো আজকে শিশুদের অসহায় মৃত্যু।