অনলাইন ডেস্ক
দেশের অর্থনীতি এখন এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি—বেসরকারি বিনিয়োগ নেমে গেছে গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ০৩ শতাংশে। টানা তৃতীয় বছরের মতো নিম্নমুখী এই প্রবণতা শুধু পরিসংখ্যানগত পতন নয়; এটি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ শক্তি ক্ষয়ে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে দেখা যায়, সরকারি বিনিয়োগও একইভাবে সংকুচিত হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে সরকারি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশে, যা আগের বছর ছিল ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ২০১৩ সালের পর এটি সর্বনিম্ন। অর্থাৎ বিনিয়োগে এখন দুই খাতেই মন্দা—বেসরকারি ও সরকারি।
কর্মসংস্থানের সংকেত লাল
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ কমার সরাসরি অর্থ হলো নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়া। প্রতিবছর শ্রমবাজারে লাখ লাখ তরুণ যুক্ত হলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না। এটি শুধু সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি নয়, দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তিকেও দুর্বল করছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বিনিয়োগ বাড়ানো এখন কেবল প্রবৃদ্ধির প্রশ্ন নয়, এটি কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সক্ষমতার প্রশ্ন। তার মতে, ব্যবসা সহজীকরণে এক দশক আগেই সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তা হয়েছে খণ্ড খণ্ডভাবে—ফলে কাঠামোগত সমস্যাগুলো থেকে গেছে।
সংস্কারহীনতার মাশুল
বিশ্বব্যাপী ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে একসময় ১৯০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৬তম। লাইসেন্স প্রাপ্তি, জমি, জ্বালানি, নীতিগত ধারাবাহিকতা—এসব মৌলিক খাতে দীর্ঘদিনের জটিলতা এখন বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে।
২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ, ডলার সংকট, আমদানি সংকোচন এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সৃষ্ট অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। নির্বাচনের তারিখ বিলম্বে ঘোষণা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখতে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করেছে।
ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলা
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমানের মতে, ২০২০ সালের পর থেকে ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি ঋণ বিতরণে গুরুতর বিকৃতি তৈরি করেছে। উৎপাদনশীল ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বদলে বড় ঋণগ্রহীতা ও প্রভাবশালীদের দিকে অর্থের স্রোত গেছে। বড় অঙ্কের ঋণ কেলেঙ্কারি এবং তদারকির দুর্বলতা প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কোণঠাসা করেছে।
তার ভাষায়, বিনিয়োগ কমে যাওয়া মানে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের পথ সংকুচিত হওয়া। ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো সহজ শর্তে ঋণ না পেলে কর্মসংস্থান তৈরির প্রধান উৎসই শুকিয়ে যায়।
উচ্চ সুদ, নিম্ন আস্থা
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সাবেক রেগুলেটরি রিফর্মস বিশেষজ্ঞ সৈয়দ আখতার মাহমুদ মনে করেন, উচ্চ সুদহার, তারল্য সংকট এবং ঝুঁকি নিতে অনীহা—সব মিলিয়ে ঋণের জোগান কমে গেছে। অনেক বড় বিনিয়োগকারী আগের কম সুদের সময়ে বিপুল ঋণ নিয়ে এখন অতিরিক্ত দায়ে জর্জরিত। ফলে নতুন করে বড় বিনিয়োগে যেতে তারা অনিচ্ছুক।
জ্বালানি সংকট ও নীতিগত অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও দুর্বল করেছে। তার মতে, বিনিয়োগ কম মানে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ছে না, বিদ্যমান সক্ষমতাও পুরোপুরি ব্যবহৃত হচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে।
প্রবৃদ্ধির ভিত্তি ভঙ্গুর
চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ—কোভিড-পরবর্তী সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই প্রবৃদ্ধি মূলত ভোগনির্ভর এবং বেসরকারি চাহিদাভিত্তিক। শক্তিশালী বিনিয়োগ ছাড়া এ প্রবৃদ্ধি টেকসই হওয়ার সুযোগ কম।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এলডিসি উত্তরণের পথে থাকা বাংলাদেশের জন্য বিনিয়োগ সংকোচন বড় সতর্কসংকেত। আজকের দুর্বল বিনিয়োগ মানে আগামীর ধীর প্রবৃদ্ধি; আর ধীর প্রবৃদ্ধি মানে বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের ঝুঁকি বৃদ্ধি।
বিনিয়োগে টানা পতন প্রমাণ করে, সমস্যাটি সাময়িক নয়; এটি কাঠামোগত। বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ, আংশিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মিলিয়ে একটি ভঙ্গুর বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এখন প্রশ্ন—নীতিনির্ধারকেরা কি বাস্তবতা স্বীকার করে সমন্বিত ও বিশ্বাসযোগ্য সংস্কারপথে হাঁটবেন, নাকি বিনিয়োগহীন প্রবৃদ্ধির ভঙ্গুর পথে অর্থনীতি আরও অনিশ্চয়তার দিকে এগোবে?
বিনিয়োগের এই নিম্নগতি শুধু অর্থনীতির সূচক নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনার সঙ্গেও জড়িত। সেই সম্ভাবনা রক্ষায় নীতিগত দৃঢ়তা ও কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি।






