স্বপ্ন প্রতিদিন রিপোর্ট:
চলতি অর্থবছর শেষে দেশি-বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে বাংলাদেশ সরকারকে ব্যয় করতে হবে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ। বর্তমান বাজারদরে (প্রতি ডলার প্রায় ১২২ টাকা ধরে) এ অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বা প্রায় ৩.৬৬ লাখ কোটি টাকা। বিশাল এ দায় সরকারের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নতুন করে চাপ তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সম্প্রতি প্রকাশিত তাদের ‘আর্টিকেল ফোর কনসালটেশন’ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে মোট ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩০ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরে এ অঙ্ক ছিল ২৬ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। সামনের অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ৩৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
আইএমএফ সতর্ক করে বলেছে, রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো না গেলে বাংলাদেশ ‘রোলওভার রিস্ক’ বা ঋণ নবায়ন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অর্থাৎ পুরোনো ঋণ শোধ করতে নতুন ঋণ নেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসবে। ফলে ভবিষ্যতে ঋণ পেতে বেশি সুদ গুনতে হতে পারে, যা বাজেট ব্যবস্থাপনাকে আরও কঠিন করে তুলবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮৮ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির প্রায় ৪১ শতাংশ। এর মধ্যে ১০১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার অভ্যন্তরীণ এবং ৮৭ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক উৎস থেকে নেওয়া।
অভ্যন্তরীণ ঋণের চাপই বর্তমানে বেশি উদ্বেগের কারণ। চলতি অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল জিডিপির ২২ দশমিক ৬ শতাংশ; তবে এই ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধে সরকারের মোট রাজস্বের ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। সমপর্যায়ের অনেক দেশের তুলনায় এ অনুপাত বেশি বলে উল্লেখ করেছে আইএমএফ।
সংস্থাটি আরও বলেছে, সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতকে ‘ক্রাউড আউট’ করতে পারে। এতে শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি শ্লথ হতে পারে। একই সঙ্গে সুদের হার ও মুদ্রাস্ফীতির ওপরও চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে ৭ শতাংশের নিচে থাকায় ঋণ ব্যবস্থাপনায় বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামী বাজেটে এ অনুপাত ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে আইএমএফের মতে, টেকসই সমাধানের জন্য মধ্যমেয়াদে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত আরও বাড়ানো জরুরি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অর্থনৈতিক ধাক্কা এলে ২০৩০ সালের মধ্যে ঋণের পরিমাণ জিডিপির ১১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। যদিও বর্তমানে ঋণের মাত্রা আইএমএফের মানদণ্ড অনুযায়ী ‘সহনীয়’, তবে ঋণ পরিশোধ ও রাজস্বের অনুপাত দ্রুত বাড়তে থাকায় ঝুঁকিও স্পষ্টভাবে বাড়ছে।
ঝুঁকি কমাতে সরকারি সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী ভিত্তি সম্প্রসারণ এবং দায় ব্যবস্থাপনা কাঠামো শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। পাশাপাশি উচ্চ সুদের বাণিজ্যিক ঋণ এড়িয়ে চলা ও ব্যাংক খাত সংস্কারে গতি আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আদায় জোরদার, ব্যয় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এ বিশাল ঋণচাপ সামাল দেওয়া সরকারের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে।