বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ও জ্বালানি তেলের কমে যাওয়া, ডলারের সংকটের নেপথ্যঘটনা কমে আসা এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ফেরার পরেও দেশের বাজারে মূল্যস্ফীতি কমার কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, সাধারণ মানুষ আরও বেশি ভোগান্তির মুখোমুখি। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অনুসারে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অবলম্বন করেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। সুদহার বৃদ্ধি ও টাকার প্রবাহ কমানোর পদক্ষেপ বাজারে চাহিদা কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, কিন্তু পণ্যের দাম নেমে আসছে না।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ তীব্র বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি খরচ, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রচারণা, প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স—সব মিলিয়ে অর্থের সরবরাহ বেড়েছে, কিন্তু তার বড় অংশ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হচ্ছে। এর ফলে চাহিদা বাড়ছে, এবং মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের বাজেটও আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে কমিশনের জন্য বরাদ্দ ২ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা, যা নির্বাচনী প্রস্তুতি ও প্রচারে আরও বৃদ্ধি পাবে। বাস্তবে প্রার্থীদের ব্যয় সরকারি হিসাবের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় কালোটাকার প্রচলন বেড়েছে, যার কারণে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে চাল, গম, ভোজ্যতেল, চিনি ও অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২০ ডলার কমেছে। চালের দাম টনপ্রতি ৬০ ডলারের বেশি কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এসব পণ্যের দাম কমেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব এবং দুর্বল তদারকির প্রমাণ। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, “মূল্যস্ফীতি শুধুমাত্র মুদ্রানীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কৃষি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজার কাঠামোর সমস্যা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব দরকারের তুলনায় বেশি।”
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সাল থেকে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। নীতি অনুযায়ী সুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। কিন্তু এই পদক্ষেপ বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে, চাহিদা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নয়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, “মূল্যস্ফীতি চাহিদাজনিত নয়। সুদহার বৃদ্ধি কোনো কার্যকর সমাধান নয়। অন্তর্বর্তী সরকার শক্তিশালী গোষ্ঠী ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনী ব্যয় ও অনুৎপাদনশীল খাতে অর্থ প্রবাহ বৃদ্ধি বাজারকে আরও উত্তপ্ত করছে।”
সবজি ও নিত্যপণ্যের দাম কমার পরিবর্তে বৃদ্ধিই হয়েছে। কৃষক পর্যায়ে দাম কমলেও ভোক্তার পর্যায়ে তা পৌঁছায়নি, যা সরবরাহ চেইনের ত্রুটিকে প্রমাণ করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও শুল্ক ছাড় এবং আমদানির সুবিধা ভোক্তার দরে প্রতিফলিত হয়নি। এ ক্ষেত্রে শুধু সুদের হার বাড়ানো বা টাকার প্রবাহ কমানো যথেষ্ট নয়। কার্যকর বাজার তদারকি ও কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
বিবিএসের তথ্য অনুসারে ২০২৫ সালে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৭৭ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। ভারতের মূল্যস্ফীতি ১ শতাংশের নিচে, পাকিস্তান ৬ শতাংশের নিচে, শ্রীলঙ্কা ২ শতাংশের কাছাকাছি। এটি প্রমাণ করে সমস্যার মূল কারণ চাহিদা নয়, বরং সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাজার কাঠামোর দুর্বলতা।
অতএব, অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর মুদ্রানীতি, সুদহার বৃদ্ধি এবং নগদ সরবরাহ সীমিত করার পদক্ষেপ ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনী ব্যয়, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং অনুৎপাদনশীল খাতে অর্থের চাপ বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঠেলে দিচ্ছে। বাজার ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া মূল্যস্ফীতি কমানো অসম্ভব প্রায়।