স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক
মানবাধিকার পরিস্থিতির সাম্প্রতিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও দেশে তথাকথিত ‘মব কালচার’ বা গণপিটুনির প্রবণতা কমেনি; বরং তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) তাদের এপ্রিল মাসের মানবাধিকার প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। ৩০শে এপ্রিল, বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি বিশদ চিত্র উপস্থাপন করা হয়।
এমএসএফ প্রতি মাসেই বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকা এবং নিজেদের অনুসন্ধানমূলক তথ্যের ভিত্তিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো সংগ্রহ করে প্রতিবেদন তৈরি করে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত এপ্রিল মাসের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গণপিটুনির ঘটনায় প্রাণহানি ও সহিংসতার মাত্রা আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে মোট ২১ জন ব্যক্তি গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন, যেখানে মার্চ মাসে এ সংখ্যা ছিল ১৯। একইভাবে, গণপিটুনির মোট ঘটনার সংখ্যা মার্চের ৩৬টি থেকে বেড়ে এপ্রিল মাসে দাঁড়িয়েছে ৪৯টিতে। আহতের সংখ্যাও বেড়েছে—মার্চে যেখানে ৩১ জন আহত হয়েছিলেন, এপ্রিল মাসে তা বেড়ে ৪৯ জনে পৌঁছেছে। এসব পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, পরিস্থিতির উন্নতি তো হয়ইনি, বরং অবনতি ঘটেছে।
এমএসএফের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, “রাষ্ট্রকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করাই হলো মব। রাষ্ট্র এবং মব একসঙ্গে চলতে পারে না।” তিনি আরও মন্তব্য করেন, “সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মবকে ‘ফুলস্টপ’ দেওয়ার কথা বলেছিলেন, কিন্তু বাস্তবে তা থামেনি; বরং বেড়েছে। এতে সরকারের সদিচ্ছা কিংবা সক্ষমতা—উভয় বিষয়েই প্রশ্ন উঠেছে।” তিনি ‘মব কালচার’-কে বিচারবহির্ভূত প্রবণতা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এ ধরনের প্রবণতা ক্রমাগত বাড়ছে, যা আইনের শাসনের জন্য গুরুতর হুমকি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এপ্রিল মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল সংখ্যক অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি শিশু, দুইজন কিশোর, ১২ জন নারী এবং ৪১ জন পুরুষ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অল্প কয়েকটি ঘটনা ছাড়া অধিকাংশ মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের সংখ্যা ছিল ৫৩। এসব মরদেহ সাধারণত নদী বা ডোবার পানিতে ভাসমান অবস্থায়, মহাসড়ক বা সড়কের পাশে, সেতুর নিচে, রেললাইনের ধারে, ফসলি জমি কিংবা পরিত্যক্ত স্থানে পাওয়া যাচ্ছে—যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এপ্রিল মাসে মোট ৩১২টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা মার্চ মাসের তুলনায় ২৩টি বেশি। এ সময়ে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫৪টি, যার মধ্যে ১৮টি শিশু এবং ১৪ জন কিশোরী ভুক্তভোগী। এছাড়া ১৪টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে একটি শিশু, চারজন কিশোরী এবং নয়জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পাশাপাশি একটি ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো, ধর্ষণের শিকারদের মধ্যে ছয়জন ছিলেন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী—যা সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি স্পষ্ট করে।
এছাড়াও এপ্রিল মাসে ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে ২৩টি, যৌন হয়রানির ঘটনা ১৭টি এবং শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ৬৮টি। এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় একজন নারী আক্রান্ত হয়েছেন। আত্মহত্যার ঘটনাও উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে। এ মাসে পাঁচজন কিশোরী এবং ২১ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। পাশাপাশি অপহরণের শিকার হয়েছে দুই শিশু ও দুইজন কিশোরী। নিখোঁজ রয়েছেন একজন কিশোরী এবং নয়জন নারী। হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি অবনতির দিকে গেছে। এপ্রিল মাসে দুইজন কিশোরী এবং পাঁচজন নারীর অস্বাভাবিক মৃত্যুসহ মোট ৮৯ জন শিশু, কিশোরী ও নারী হত্যার শিকার হয়েছেন—যা মার্চ মাসের তুলনায় ১৬টি বেশি। নিহতদের মধ্যে ১১ জন শিশু এবং ১২ জন কিশোরী রয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আইনকে উপেক্ষা করে কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে বেআইনি সালিশের মাধ্যমে ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার মতো গুরুতর অপরাধের নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
এপ্রিল মাসে অন্তত দুটি এমন ঘটনা ঘটেছে—একটি শিশু ধর্ষণচেষ্টা এবং একটি নারী ধর্ষণচেষ্টা—যেখানে সমাজপতিরা আপসের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করেছেন। এটি বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এবং আইনের শাসনের অবক্ষয়ের স্পষ্ট উদাহরণ।
উল্লেখ্য, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ শপথ গ্রহণের পর ১৮ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে ‘মব কালচার’ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা হবে। তবে এমএসএফের এপ্রিল মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি; বরং মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিল মাসে ‘মব কালচার’-এর বিস্তার আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
সার্বিকভাবে, এমএসএফের এই প্রতিবেদন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার বর্তমান অবস্থার ওপর গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে। এটি স্পষ্ট করে যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।






