স্বপ্ন প্রতিদিন ডেস্ক
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর পরিবহন খাতে ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। সরকারের হিসাবে ডিজেলের দাম বেড়েছে ১৫ শতাংশ। তবে মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া অনেক ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে কৃষিপণ্য থেকে আমদানি পণ্য—সব ধরনের পণ্য পরিবহনে ব্যয় বেড়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত চাপ পড়ছে ভোক্তার ওপর। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ সংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক এলাকায় যানবাহনের সংকট দেখা দিচ্ছে। এতে কৃষিপণ্য, খাদ্যশস্য, কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
রাজধানীসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চাল, ডাল, ডিম, মাছ ও সবজির দামে এরই মধ্যে প্রভাব পড়েছে। মিনিকেট চাল কেজিপ্রতি ৮২ থেকে ৮৫ টাকা এবং নাজিরশাইল ৮৮ থেকে ৯৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগের তুলনায় কয়েক টাকা বেশি। ডালের দাম কেজিতে প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে। ডিমের দামও প্রতি পিসে ২ থেকে আড়াই টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সবজির মধ্যে বেগুন ও শিমের মতো পণ্যের দাম ১০০ থেকে ১২০ টাকায় উঠেছে। মাছের দাম কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণেই এসব পণ্যের দাম বাড়ছে।
চালের অন্যতম বড় জোগানকেন্দ্র নওগাঁ থেকে ঢাকায় ট্রাক ভাড়া বেড়ে এখন প্রায় ২০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগে ছিল ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা। নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় চালের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। তেলের সংকট অব্যাহত থাকলে ভাড়া আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোরসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদন এলাকা থেকেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে ঢাকার রুটে ট্রাক ভাড়া ২২ থেকে ২৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকায় উঠেছে। চট্টগ্রাম রুটে তা ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। পরিবহন মালিকদের দাবি, জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি পাম্পে পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় তাঁদের ব্যয় আরও বেড়েছে, ফলে ভাড়া বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে, যা দেশের অন্যতম বড় পাইকারি ভোগ্যপণ্যের বাজার, সেখান থেকেও বিভিন্ন গন্তব্যে ট্রাক ভাড়া ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের ভাষ্য, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরেও পরিবহন সংকট ও ভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। আমদানিকারকেরা বলছেন, ট্রাকের অভাবে পণ্য খালাস ব্যাহত হচ্ছে এবং বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এতে আমদানীকৃত খাদ্যপণ্যের দামও বাড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; উৎপাদন থেকে বাজারজাত—সব পর্যায়ে ব্যয় বাড়ায়, যা মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বিপণন—দুই ক্ষেত্রেই খরচ বাড়ে, ফলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই এর বোঝা বহন করতে হয়।
তবে ভাড়া বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটির সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, জ্বালানির দাম ১৫ শতাংশ বাড়লেও পরিবহন ভাড়া ৩৫ শতাংশ বাড়ার কোনো যুক্তি নেই। তাঁর মতে, পরিবহন ব্যয়ের সবটাই জ্বালানিনির্ভর নয়, তাই এ বৃদ্ধি অযৌক্তিক।
অন্যদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব খাদ্যমূল্যে পড়বে না। তিনি জানান, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য টিসিবির কার্যক্রমসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি চালু রয়েছে এবং বাজার তদারকি বাড়ানো হবে।
তবে বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। পরিবহন খরচের এই ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।






