জ্বালানি সংকটে একের পর এক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকা, সিস্টেম লসসহ বিভিন্ন কারণে গাজীপুরে বেড়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংয়ের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। শহর অঞ্চলে লোডশেডিং কিছুটা কম হলেও গ্রাম অঞ্চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকছে না বিদ্যুৎ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, গাজীপুরে গড়ে ৭ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দৈনন্দিন জীবনে যেমন সমস্যা হচ্ছে তেমনিভাবে বিভিন্ন কারখানায় কমেছে উৎপাদন। আর এতে লোকসানের মুখে পড়েছেন উদ্যোক্তারা। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ইটাহাটা এলাকার রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী কাজল ফকির জানান, এই এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং। তার হোটেলটি প্রতিদিন ভোরে খোলেন এবং বন্ধ করেন রাত ১১টায়। এ সময়ের মধ্যে অন্তত ছয় থেকে সাতবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে। এতে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়। নাওজোড় এলাকার বাসিন্দা আবুল হাশেম বলেন, ‘তীব্র গরমে দিনে ৬ থেকে ৭ বার লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতিবার লোডশেডিংয়ে অন্তত এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে মোটর দিয়ে পানি উত্তোলন করতে সমস্যা হচ্ছে। ওযু–গোসলে যেমন সমস্যা হচ্ছে তেমনিভাবে লোডশেডিংয়ের সময় গরমে ঘরে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়ছে।’ কলেজ পাড়া এলাকার একজন গৃহিণী বলেন, ‘২১ এপ্রিল থেকে আমার ছেলের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। গত কয়েক দিন ধরে লোডশেডিংয়ের কারণে এমনিতেই ছেলের পড়াশোনা বিঘ্ন হয়েছে। এখন পরীক্ষা চলাকালে এভাবে লোডশেডিং থাকলে আমাদের সমস্যা তো হবেই।’ শহর এলাকায় তুলনামূলকভাবে লোডশেডিং কম হলেও শহরের বাইরে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর আওতাধীন এলাকায়দিনে-রাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এই সমিতি গাজীপুর শহর ছাড়াও কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, কালীগঞ্জ ও কাপাসিয়া উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কমেছে কারখানায় উৎপাদন
গাজীপুরে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কমেছে কারখানাগুলোর উৎপাদন। গাজীপুরে কমবেশি ৫ হাজার শিল্প কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ তৈরি পোশাক শিল্প। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানায় যন্ত্রপাতি চালাতে সমস্যা হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেল চালিত জেনারেটর ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু ডিজেল সংকটের কারণে তাদের সেই জেনারেটর চালাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। এতে বেশিরভাগ সময় শ্রমিকেরা বেকার বসে থাকছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রপ্তানিমুখী এ শিল্প। আর্থিক লোকসানে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ ব্যাপারে স্থানীয় ইয়ন নীট কম্পোজিট কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ হাসান বলেন, ‘দিনের মধ্যে বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানায় মেশিনপত্র ক্ষতি হচ্ছে, উৎপাদন কমে গেছে। আমরা সময়মতো শিপমেন্ট করতে পারছি না। ডিজেল কিনে জেনারেটর চালাব, সেখানেও সমস্যা। পাম্পে ডিজেল নেই, যেটুকু পাওয়া যায় দাম বাড়ানোর কারণে এখন লিটার প্রতি বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বায়ার বা বিদেশের ক্রেতারা অর্ডারের সময় আগে পণ্যের যে দাম দিতেন এখনও তাই দিচ্ছেন কিন্তু আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। ফলে কারখানা পরিচালনা করতে নানামুখী সমস্যা হচ্ছে।’ গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর মোট বিদ্যুতের চাহিদা ৪৮৪ মেগাওয়াট, যেখানে সরবরাহ মিলছে ৩১২ মেগাওয়াট। ঘাটতি ১৭২ মেগাওয়াট। তাই বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর আওতাধীন এলাকায় চাহিদা ১৪০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং হচ্ছে ৫০ মেগাওয়াট। ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর আওতাধীন শ্রীপুর ও মাওনা অঞ্চলে ১৫০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর অধীন কালিয়াকৈর উপজেলায় চাহিদা ২০০ মেগাওয়াট, বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ১২০ মেগাওয়াট। প্রায় ৫ হাজার শিল্পকারখানা থাকা এ জেলায় প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে।
গাজীপুর পল্লী বিদ্যুতের মহাব্যবস্থাপক মো. আবুল বাশার আজাদ বলেন, ‘চাহিদা ৪৮৪ মেগাওয়াটের, যেখানে সরবরাহ মিলছে ৩১২ মেগাওয়াট। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ায় গড়ে ৩০ ভাগ লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এতে জেলায় গড়ে ৪-৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। তবে আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করছি।’






