সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ও তার পিএস মাসুমের বিরুদ্ধে অবৈধ প্রক্রিয়ায় ২৮৬ সাব রেজিস্ট্রার বদলি করে শতকোটি ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন করা হয়েছে। আজ বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন এই আবেদন করেন। এই অভিযোগ ছাড়াও আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা ও জামিন বাণিজ্য, বিচারক পদায়ন, অর্থপাচার, অন্যান্য দুর্নীতিসহ এক ডজনের বেশি অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এসব দুর্নীতি করে শত শত কোটি টাকার আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। বর্তমানে অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। যদিও নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে ফেসবুকে স্ট্যাটাসও দিয়েছেন সাবেক এই উপদেষ্টা।
সাব রেজিস্ট্রার বদলি সংক্রান্ত অভিযোগে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের আট মাসে আইন মন্ত্রণালয়ে শুধু সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতেই ঘুষ লেনদেন হয়েছে শতকোটি টাকা। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের আমলে সাব-রেজিস্ট্রার বদলির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নীতিমালা মানা হয়নি।
ঘুষের বিনিময়ে বদলির ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত টাকা পরিশোধ না করায় বদলির আদেশ স্থগিত করার প্রমাণও রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাউকে কাউকে ছয়-সাত মাসের মধ্যে তিন-চার বার বদলি করা হয়েছে। আট মাসে (অক্টোবর-২৪ থেকে এপ্রিল-২৫ পর্যন্ত) নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে কমপক্ষে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২০০ জন ঘুষের মাধ্যমে পছন্দের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি বাগিয়ে নিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে পছন্দের অফিসে বদলির আদেশ পেয়েছেন তারা। অতীতে কখনো মাত্র আট মাসে এত বিপুলসংখ্যক বদলির ঘটনা ঘটেনি।
অভিযোগে বলা হয়, বদলির নীতিমালা অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এ, বি ও সি গ্রেডের অফিসে অনুরূপভাবে এ, বি ও সি গ্রেডের কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন করার বিধান রয়েছে। কিন্তু আট মাসে এই নীতিমালার তোয়াক্কা করা হয়নি। ওই সময়কালে ঘুষের বিনিময়ে সি ও বি গ্রেডের সাব-রেজিস্ট্রারদের অনেককেই পোস্টিং দেওয়া হয়েছে উচ্চতর গ্রেডের কার্যালয়ে।
এক্ষেত্রে ঘুষ দিতে রাজি না হওয়ায় এ গ্রেডের সাব-রেজিস্ট্রারদের শাস্তিমূলক বি বা সি গ্রেডের অফিসে বদলি করা হয়েছে।গত বছরের ১ জুন খোদ আইন মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে সতর্কতা জারি করে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জেলার রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রার বদলি ও পদায়নে কোনো আর্থিক লেনদেনের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে কোনো অসাধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক কোনো ধরনের প্রলোভন, প্রস্তাব বা প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ করা হলো। কিন্তু এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই শত শত সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে বিপুল অঙ্কের ঘুষের লেনদেন হয়েছে। এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আর কোনো বদলির আদেশ হয়নি।
অন্যান্য দুর্নীতির অভিযোগ
সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের এক ডজনের বেশি অভিযোগ দুদকে জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- মামলা বাণিজ্য, জামিন বাণিজ্য, বিচারক পদায়ন এবং অন্যান্য দুর্নীতি। অভিযোগে বলা হয়, আসিফ নজরুল জামিন বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই অভিযোগে একটি শিল্প গ্রুপের সিইও, জালিয়াতির মাধ্যমে ভাই এবং বোনের সম্পত্তি আত্মসাৎ করেন। ছোট বোন তার বিরুদ্ধে মামলা করে, পিবিআই মামলা তদন্ত করে জালিয়াতির প্রমাণ পায়। আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়। কিন্তু আসিফ নজরুল ২০ কোটি টাকা নিয়ে ভিআইপি আসামিকে জামিন দেওয়ার নির্দেশ দেন।
গান বাংলা টেলিভিশনের তাপসের জামিনেও বিপুল অঙ্কের লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এভাবে আসিফ নজরুল ১৮ মাসে টাকার বিনিময়ে অনেক জামিন বাণিজ্য করেছেন। এ ছাড়া আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে পদায়নে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। ঢাকা এবং আশপাশের এলাকায় বিচারক বদলিতে আসিফ নজরুল ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত নিতেন বলে অভিযোগে বলা হয়। তার বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে।