যুদ্ধে বিপর্যস্ত, আতঙ্কিত পৃথিবীতে ‘নির্ভয়ে গাইতে পারা’ এবং ‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রত্যাশার’ কথা জানিয়ে বাংলা নতুন বছরকে বরণ করল সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। নববর্ষের প্রথম প্রভাতে ছায়ানট এমন স্বপ্নের মাতৃভূমির কথা বলেছে, যেখানে— ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির/ জ্ঞান যেথা মুক্ত, গৃহের প্রাচীর’।
ছায়ানট সভাপতি সারওয়ার আলী বলেছেন, “মার্কিন-ইসরায়েলি নিগ্রহে আজ পারস্য সভ্যতাও ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন। বিশ্ববাসী আজ বিপর্যস্ত ও আতঙ্কিত। স্বদেশে আজ নুতন বছরের প্রথম প্রভাতে সবাই কামনা করে বিশ্বশান্তি।
“শুনতে চাই সমাজের অভয়বাণী—যেন সংবাদকর্মীরা নির্ভয়ে প্রকৃত মত প্রকাশ করতে পারে; সকলে যেন নির্ভয়ে গাইতে পারি; যেন সংস্কৃতির সকল প্রকাশ নির্বিঘ্ন হয়—বাঙালি শঙ্কামুক্ত জীবন-যাপন করে।”
বিগত বছরের ধারাবাহিকতায় নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে ঢাকার রমনার বটমূল প্রাঙ্গণে উদযাপন অনুষ্ঠান আয়োজন করে ছায়ানট। ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’— প্রতিপাদ্যে সাজানো এবারের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান ছিল গান, আবৃত্তি ও বক্তব্যে সমৃদ্ধ এক বর্ণিল সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সম্মেলক গান ‘জাগো আলোক-লগনে’ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। অজয় ভট্টাচার্যের কথায় ও ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের সুরে গানটি পরিবেশন করেন মিরাজুল জান্নাত সোনিয়া, ঐশ্বর্য সমাদ্দার, প্রিয়ন্তু দেব ও সমুদ্র শুভম।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে বক্তব্য দেন ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী।
তিনি বলেন, “পহেলা বৈশাখ বাঙালি-সংস্কৃতি তথা জাতিসত্তা উন্মোচনের এক বিশেষ দিন। বিগত প্রায় ছয় দশকের মতো এই দিনটিতে আমরা সকল গ্লানি জ্বরা মুছে ফিরে দেখি, ফেলে আসা বছরকে।”
ষাটের দশকে রমনার বটমূলে যে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা করেছিল ছায়ানট, এখন তা বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।
১৯৬৭ সালে শুরু হওয়া এ উৎসব-আয়োজন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বছর ছাড়া প্রতিটি পহেলা বৈশাখেই হয়েছে; নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়েছে সুরের মূর্ছনা আর কথামালায়। কোভিডের দুবছর এ আয়োজন করা হয় ভার্চুয়ালি।
২০০১ সালে ছায়ানটের বৈশাখ বরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। তাতে ১০ জন নিহত হন। এরপর থেকে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেই প্রতি বছর বর্ষবরণের এ আয়োজন হচ্ছে।
গত বছরেও রমনায় নির্বিঘ্নে নববর্ষের অনুষ্ঠান আয়োজন এবং ১৬ ডিসেম্বর উন্মুক্ত মঞ্চে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের দুদিন পরেই ছায়ানট কার্যালয় আক্রান্ত হওয়ার কথা বক্তব্যে স্মরণ করেন ছায়ানট সভাপতি।
সারওয়ার আলী বলেন, “গভীর রাতে, ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনে ভাঙা হারমোনিয়াম-তবলা-তানপুরা এবং নালন্দার ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন শিশু-পুস্তকের দুঃসহ স্মৃতি। সেই রাতেই অগ্নিসংযোগ করা হয় দুই শীর্ষ সংবাদপত্র ভবনে। পরদিন আক্রান্ত উদীচী।
“এই সহিংস ঘটনাবলীর কদিন আগেই, অপদস্থ হয়েছেন বাউল শিল্পীরা। স্মরণে জেগে ওঠে, এই বটমূলে ২০০১ সালের ভয়াবহ অঘটন।”
ছায়ানট সভাপতি বলেন, “যে সঙ্গীত বাঙালির আনন্দ-বেদনা- মিলন- বিরহ-সংকট-এর সঙ্গী; মুক্তিযুদ্ধ থেকে সকল অধিকার অর্জনের অবলম্বন; সকল ধর্ম-জাতির মানুষকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে; কোনো অপশক্তি ভয় দেখিয়ে সেই সঙ্গীত থেকে শান্তিপ্রিয় মানুষকে নিরস্ত করতে চায়। তারা আবহমান বাংলা গানকে তার সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার থেকে শেকড়বিচ্ছিন্ন করতে উদ্যত।”
সমাজে অসহিষ্ণুতা এবং আপন মত প্রকাশে দলবদ্ধ নিগ্রহের শঙ্কা বেড়েছে বলে মনে করেন করেন সারওয়ার আলী।
এবারের অনুষ্ঠান গাঁথা হয় ৮টি সম্মেলক ও ১৪ টি একক গান এবং ২টি পাঠ দিয়ে। এতে অংশ নেন প্রায় ২০০ শিল্পী।
সকালের স্নিগ্ধ প্রকৃতি এবং মানব ও দেশপ্রেমের গানের পাশাপাশি পরিবেশনায় ছিল লোক জনজীবনের সুর। বিশেষ সংযোজন ছিল বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রখ্যাত গণসঙ্গীতজ্ঞ সলিল চৌধুরী ও পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের দুর্দম গীতিকার-সুরকার মতলুব আলীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।
অনুষ্ঠানে একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন দেশের স্বনামধন্য শিল্পীরা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একাধিক গান পরিবেশন করেন মাকছুরা আখতার অন্তরা, আজিজুর রহমান তুহিন, সেমন্তী মঞ্জরী, তানিয়া মান্নান ও লাইসা আহমদ লিসা।
কাজী নজরুল ইসলামের গান পরিবেশন করেন বিটু কুমার শীল, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, নাসিমা শাহীন ফ্যান্সি, খায়রুল আনাম শাকিল ও শারমিন সাথী ইসলাম ময়না। এছাড়া দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান গেয়ে শোনান শ্রাবন্তী ধর।
অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়, পরিবেশনায় সত্যেন্দ্রনাথ দত্তসহ বিভিন্ন কবির কবিতা স্থান পায়। এছাড়া সলিল চৌধুরীর ‘এক গুচ্ছ চাবি’ আবৃত্তি করেন খায়রুল আলম সবুজ।
সম্মেলক পরিবেশনায় ছিল ‘ভয় হতে তব অভয় মাঝে’, ‘জগতে আজিকে যারা’, ‘পথে এবার নামো সাথী’, ‘এসো মুক্ত করো’ এবং ‘সেদিন আর কত দূরে’সহ নানা গান।
ছোট ও বড়দের যৌথ অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। লোকগান ও পল্লীগীতির পরিবেশনায়ও ছিল বৈচিত্র্য। লালন সাঁইয়ের ‘বড় সংকটে পড়িয়া দয়াল’ গানটি পরিবেশন করেন চন্দনা মজুমদার। এছাড়া আবদুল লতিফ, মতলুব আলী ও সাধন চন্দ্র বর্মণের গান পরিবেশিত হয় দলীয় কণ্ঠে।
সবশেষে জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে বর্ষবরণের এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনের।